ব্যবসায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ: গুহা থেকে গ্লোবাল ভিলেজ
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজ আমরা জানব ব্যবসার ইতিহাস সম্পর্কে। তোমরা কি কখনো ভেবেছ, আজকের দিনে আমরা চাইলেই সুপারশপ থেকে জিনিস কিনছি বা ঘরে বসে অনলাইনে অর্ডার করছি—এই ব্যবস্থাটা কি একদিনে হয়েছে? একদমই না! এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। মানুষের অভাববোধ বা চাহিদা থেকেই মূলত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শুরু।
চলো, ইতিহাসের সেই সময়রেখা ধরে ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশকে তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করে আলোচনা করি।
১. প্রাচীন যুগ (Ancient Age): অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
ব্যবসা বা বাণিজ্যের একদম শুরুর দিকে মানুষের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু বেঁচে থাকা বা ক্ষুধা মেটানো। তখন আজকের মতো বড় মার্কেট বা টাকা-পয়সা ছিল না।
- পশু ও মৎস্য শিকার: আদিম মানুষ বনে-জঙ্গলে ঘুরে পশু শিকার করত এবং নদী-নালা থেকে মাছ ধরত। এটিই ছিল তাদের প্রধান কাজ।
- ফলমূল আহরণ ও কৃষিকার্য: এরপর মানুষ যখন দেখল শিকার সব সময় পাওয়া যায় না, তখন তারা বনের ফলমূল সংগ্রহ শুরু করল এবং ধীরে ধীরে কৃষিকাজ শিখল।
- দ্রব্য বিনিময় প্রথা (Barter System): এটি এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট। মনে করো, তোমার কাছে অনেক ধান আছে কিন্তু মাছ নেই। আবার তোমার বন্ধুর কাছে মাছ আছে কিন্তু ধান নেই। তখন তোমরা একে অপরের সাথে পণ্য অদলবদল করলে। একেই বলা হয় ‘বিনিময় প্রথা’।
বিনিময় প্রথার সীমাবদ্ধতা বা সমস্যা
দ্রব্য বিনিময় প্রথায় একটি বড় সমস্যা দেখা দিল। ধরো, তোমার চাল দরকার, কিন্তু যার কাছে চাল আছে তার তোমার পণ্যটি দরকার নেই। তখন লেনদেন করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। এই প্রয়োজন থেকেই মানুষ পরের ধাপে পা বাড়াল।
২. মধ্য যুগ (Medieval Age): মুদ্রার প্রচলন ও বাজারের সৃষ্টি
বিনিময় প্রথার অসুবিধা দূর করার জন্য এই যুগে মানুষ লেনদেনের একটি সাধারণ মাধ্যম খুঁজছিল। এখান থেকেই আধুনিক ব্যবসার ভিত্তি স্থাপিত হয়।
বিনিময় মাধ্যম (Currency Evolution):
- শুরুতে দুষ্প্রাপ্য শামুক, ঝিনুক, কড়ি ও পাথর ব্যবহার করা হতো টাকার বিকল্প হিসেবে।
- পরবর্তীতে মানুষ দেখল এগুলো সহজে বহনযোগ্য নয় বা ভেঙে যায়। তাই এল স্বর্ণ, রৌপ্য ও ধাতব মুদ্রা।
- ধাতব মুদ্রাও যখন ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলো, তখন প্রচলন হলো কাগজি মুদ্রা বা টাকার। যা ব্যবসার গতি অনেক বাড়িয়ে দিল।
বাজার ও শহর সৃষ্টি:
মানুষ তাদের পণ্য কেনাবেচার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো হতে শুরু করল। এভাবেই গ্রাম্য হাট, গঞ্জ এবং পরবর্তীতে বড় বড় শহরের সৃষ্টি হলো।
ব্যবসায় সংগঠন:
একা ব্যবসা করার পাশাপাশি মানুষ দলবদ্ধ হয়ে ব্যবসা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। এখান থেকেই অংশীদারি বা সংঘবদ্ধ ব্যবসার ধারণা জন্ম নিল।
৩. আধুনিক যুগ (Modern Age): প্রযুক্তির বিপ্লব
আমরা এখন যে যুগে বাস করছি, তা হলো আধুনিক যুগ। এই যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তি এবং বিশাল আকারের উৎপাদন।
- শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution): অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব হয়। এর ফলে হাতে তৈরির বদলে মেশিনে পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। এতে উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT): বর্তমান সময়ে ব্যবসার প্রাণ হলো প্রযুক্তি। ইন্টারনেট, কম্পিউটার এবং সফটওয়্যার ব্যবহার করে এখন এক দেশের পণ্য নিমিষেই অন্য দেশে বিক্রি হচ্ছে।
- বৃহদায়তন উৎপাদন ও বণ্টন: এখন আর অল্প পণ্য তৈরি হয় না। বড় বড় ফ্যাক্টরিতে লক্ষ লক্ষ পণ্য তৈরি হয় এবং তা সঠিক ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
- ব্যাংক: মূলধন জোগাড়ের জন্য ব্যাংকিং খাতের বিশাল প্রসার ঘটেছে।
- এটিএম (ATM) ও মোবাইল ব্যাংকিং: এখন পকেটে টাকা না থাকলেও সমস্যা নেই। এটিএম কার্ড বা বিকাশ/নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবসার লেনদেনকে করেছে অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুত।
| যুগ | প্রধান বৈশিষ্ট্য | কেন পরিবর্তন হলো? |
| প্রাচীন | শিকার, কৃষি, বিনিময় প্রথা | মানুষের চাহিদা বাড়ল, বিনিময় প্রথায় সমস্যা দেখা দিল। |
| মধ্য | ধাতব ও কাগজি মুদ্রা, বাজার সৃষ্টি | লেনদেন সহজ করার প্রয়োজন হলো এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ল। |
| আধুনিক | শিল্প বিপ্লব, প্রযুক্তি, মোবাইল ব্যাংকিং | দ্রুত উৎপাদন, সারা বিশ্বে পণ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। |
এটি নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবসায় উদ্যোগ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের বোর্ড বইয়ের একটি অংশ। এটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারে।
বইয়ের এই অংশটুকু থেকে আমরা নিচে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তরসহ দিয়ে দিলাম শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিসের জন্য।
৫টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (উত্তরসহ)
১. ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের ধারাকে কয়টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে?
(ক) ২টি (খ) ৩টি (গ) ৪টি (ঘ) ৫টি
উত্তর: (খ) ৩টি
২. ‘কাগজি মুদ্রা’র প্রচলন কোন যুগে শুরু হয়?
(ক) প্রাচীন যুগে (খ) মধ্য যুগে (গ) আধুনিক যুগে (ঘ) প্রাগৈতিহাসিক যুগে
উত্তর: (খ) মধ্য যুগে
৩. নিচের কোনটি আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য?
(ক) মৎস্য শিকার (খ) বাজার ও শহর সৃষ্টি (গ) মোবাইল ব্যাংকিং প্রচলন (ঘ) দ্রব্য বিনিময়
উত্তর: (গ) মোবাইল ব্যাংকিং প্রচলন
৪. প্রাচীন যুগে বিনিময়ের মাধ্যম কী ছিল?
(ক) স্বর্ণ ও রৌপ্য (খ) দ্রব্য বা পণ্য (গ) এটিএম কার্ড (ঘ) শামুক ও ঝিনুক
উত্তর: (খ) দ্রব্য বা পণ্য
৫. শিল্প বিপ্লব কোন যুগের নিদর্শন?
(ক) প্রাচীন যুগ (খ) মধ্য যুগ (গ) আধুনিক যুগ (ঘ) বর্তমান যুগ
উত্তর: (গ) আধুনিক যুগ
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
১. প্রশ্ন: প্রাচীন যুগে মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক কাজগুলো কী কী ছিল?
উত্তর: পশু শিকার, মৎস্য শিকার, ফলমূল আহরণ ও কৃষিকার্য।
২. প্রশ্ন: কোন যুগে বাজার ও শহরের সৃষ্টি হয়?
উত্তর: মধ্য যুগে।
৩. প্রশ্ন: আধুনিক যুগে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির দুটি অবদান উল্লেখ করো।
উত্তর: এটিএম (ATM) কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং।
৪. প্রশ্ন: দ্রব্য বিনিময়ের অসুবিধা দূর করতে মধ্য যুগে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রথমে কী ব্যবহার করা হতো?
উত্তর: দুষ্প্রাপ্য শামুক, ঝিনুক, কড়ি ও পাথর।
৫. প্রশ্ন: ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের সর্বশেষ পর্যায় বা যুগ কোনটি?
উত্তর: আধুনিক যুগ।
অনুধাবন ও প্রয়োগমূলক প্রশ্ন
১. "দ্রব্য বিনিময় প্রথা" বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।
২. মধ্য যুগে কেন স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল?
৩. ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশে "শিল্প বিপ্লব"-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
প্রয়োগমূলক প্রশ্ন (দৃশ্যকল্প বা উদ্দীপকের আলোকে)
১. আব্দুর রহিম তার গ্রামের বাড়িতে ধান চাষ করেন এবং সেই ধানের বিনিময়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে মাছ সংগ্রহ করেন। আব্দুর রহিমের এই কাজটি ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের কোন যুগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো।
২. বর্তমানে আমরা কেনাকাটার বিল পরিশোধে এটিএম কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করি। উদ্দীপকের ছক অনুযায়ী এটি কোন যুগের নির্দেশক এবং কেন? ব্যাখ্যা করো।
উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্ন (উত্তর সংকেতসহ)
১. প্রশ্ন: "বিনিময় প্রথার সীমাবদ্ধতাই মূলত অর্থের প্রচলন ও ব্যবসায়িক ক্রমবিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে"—উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর সংকেত: এখানে আলোচনা করতে হবে প্রাচীন যুগের 'দ্রব্য বিনিময়' প্রথার সমস্যাগুলো (যেমন: চাহিদার অমিল, বহন অযোগ্যতা)। এরপর দেখাতে হবে কীভাবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যযুগে শামুক, ঝিনুক এবং পরবর্তীতে ধাতব ও কাগজি মুদ্রার প্রচলন হলো, যা ব্যবসাকে সহজ করেছে।
২. প্রশ্ন: "আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত"—ছকে প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর সংকেত: আধুনিক যুগের কলামে থাকা 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি', 'এটিএম কার্ড', 'মোবাইল ব্যাংকিং' এবং 'বৃহদায়তন উৎপাদন'-এর উল্লেখ করে বোঝাতে হবে যে, এখন ব্যবসা আর সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নেই এবং প্রযুক্তির কারণেই তা দ্রুত হচ্ছে।
৩. প্রশ্ন: "মধ্যযুগ হলো প্রাচীন ও আধুনিক যুগের সেতুবন্ধন"—তুমি কি এই মতের সাথে একমত? যুক্তিসহ মতামত দাও।
উত্তর সংকেত: হ্যাঁ, একমত পোষণ করা যায়। কারণ প্রাচীন যুগের আদিম ব্যবস্থা থেকে আধুনিক যুগের শিল্পায়নে পৌঁছানোর জন্য 'মুদ্রার আবিষ্কার', 'বাজার সৃষ্টি' এবং 'ব্যবসায় সংগঠন'-এর ভিত্তি মধ্যযুগেই স্থাপিত হয়েছিল। এই ভিত্তি না থাকলে আধুনিক যুগ আসত না।
৪. প্রশ্ন: উদ্দীপকে উল্লেখিত আধুনিক যুগের উপাদানগুলো বর্তমান অর্থনীতিকে কীভাবে গতিশীল করেছে? তোমার নিজস্ব মতামত দাও।
উত্তর সংকেত: এখানে এটিএম কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ব্যাংক-বিমা ব্যবস্থার গুরুত্ব লিখতে হবে। এগুলো কীভাবে সময় বাঁচাচ্ছে, লেনদেন নিরাপদ করছে এবং বড় আকারের শিল্প কারখানা স্থাপনে সাহায্য করছে—তা নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে।
সৃজনশীল প্রশ্ন
উদ্দীপক: গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি জনাব আব্দুল্লাহ নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, "বহুকাল আগে মানুষের জীবন আজকের মতো এত সহজ ছিল না। তখন মানুষ বনে-জঙ্গলে পশু শিকার করত এবং নিজের উৎপাদিত ফসলের বিনিময়ে অন্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত। তখন কোনো টাকার প্রচলন ছিল না।" অন্যদিকে, জনাব আব্দুল্লাহর ছেলে রাফসান সাহেব ঢাকায় একটি বড় টেক্সটাইল মিলের মালিক। তিনি এখন ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশের বায়ারদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম কার্ড ব্যবহার করে মুহূর্তেই ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করেন।ন
ক. ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের ধারাকে কয়টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে?
খ. 'বিনিময় প্রথা' বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।
গ. জনাব আব্দুল্লাহর বর্ণনায় ব্যবসায়ের ক্রমবিকাশের কোন যুগের চিত্র ফুটে উঠেছে? উদ্দীপকের আলোকে ব্যাখ্যা করো।
ঘ. "রাফসান সাহেবের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিফলন"— উদ্দীপকের আলোকে উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।
%20(1).jpg)