আসসালামু আলাইকুম প্রিয় শিক্ষার্থীরা। এই লেখাতে আপনাদের নবম এবং দশম শ্রেণি বা এসএসসি এর বোর্ড বইয়ের প্রথম অধ্যায় "ব্যবসায় পরিচিতি" এর যেই দুটি সৃজনশীল প্রশ্ন দেয়া হয়েছে তার উত্তর দেয়া হলো। সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর মূলত নিজেকেই পুরো বিষয়গুলো বুঝে করতে হয়। তবে করতে গিয়ে অনেকেই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকতে পারে। তাদের অনুশীলনের জন্যই এই লেখা। মুখস্ত করে পরীক্ষায় উত্তর লেখার চিন্তা না করে নিজ থেকে বুঝে লিখতে পারলেই প্রকৃত সৃজনশীলতার চর্চা হবে।
সৃজনশীল প্রশ্ন
১. অভিন্নতারা গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসের বাবা গ্রামের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি মানসম্মত ওষুধও বিক্রি করেন। গ্রামে বিভিন্ন রোগের ওষুধের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি সব ধরনের ওষুধ ক্রয় করতে পারেন না। সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে ওষুধ কোম্পানির এজেন্টেরা প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো পৌঁছাতে পারেন না। অন্যদিকে দোকানে সংরক্ষণের সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক ওষুধ নষ্ট হয়ে যায়।
ক. ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
খ. শিল্প বলতে কী বোঝায়? উদাহরণ দাও।
গ. নাফিসের বাবার ব্যবসায়ীটি কোন ধরনের? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. নাফিসের বাবার পক্ষে এলাকাবাসীর চাহিদা মাফিক ওষুধ সরবরাহ করতে না পারার প্রধান কারণ কোনটি বলে তুমি মনে করো? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
২. বাংলাদেশ একসময় ব্যবসায়-বাণিজ্যে সারা বিশ্বে সুপরিচিত ছিল। এ দেশে এমন একটি বস্ত্ৰ তৈরি হতো যার খ্যাতি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর আবহাওয়া ও জলীয়বাষ্প সে বিখ্যাত বস্ত্ৰটির সূতা তৈরিতে সহায়ক ছিল। সাথে শ্রমিক ও কারিগরদের আন্তরিক পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা। বর্তমানে ব্যবসায়িক পরিবেশের সবগুলো উপাদানকে উন্নয়ন ঘটাতে পারলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের অধিক প্রসার ঘটবে এবং ফিরে আসবে অতীত গৌরব।
ক. কোন বস্ত্ৰের জন্য বাংলাদেশের খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল?
খ. ব্যবসায়িক পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।
গ. কোন পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্দীপকে উল্লিখিত শ্রমিক ও কারিগরদের সৃজনশীলতা বিকাশ সম্ভব? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. বর্তমানে দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে উদ্দীপকে উল্লিখিত ব্যবসায়ের কোন পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি বলে তুমি মনে করো? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
প্রশ্নগুলোর উত্তর
১ নং প্রশ্নের উত্তর
ক. ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
ব্যবসায়ের প্রধান উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন।
খ. শিল্প বলতে কী বোঝায়? উদাহরণ দাও।
সাধারণ অর্থে শিল্প বলতে সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে প্রকৃতির প্রদত্ত সম্পদকে রূপান্তর করে মানুষের ব্যবহার উপযোগী পণ্য বা সেবায় পরিণত করা হয়। এটি উৎপাদনের বাহন বা প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। পণ্যকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এর উপযোগিতা সৃষ্টি করাই হলো শিল্পের মূল কাজ।
উদাহরণস্বরূপ, বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করা হয় এবং এই কাঠকে ব্যবহার করে আসবাবপত্র তৈরি করা হয়। এই কাঠ সংগ্রহ থেকে শুরু করে আসবাবপত্র নির্মাণ পর্যন্ত যাবতীয় প্রক্রিয়া শিল্প হিসেবে গণ্য। শিল্পের মাধ্যমে একটি পণ্যের আকৃতিগত পরিবর্তন আনা হয়, ফলে পণ্যটি ভোক্তার নিকট আরও মূল্যবান ও ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। এটি ব্যবসায়ের একটি মৌলিক কাজ, যা সরাসরি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত।
গ. নাফিসের বাবার ব্যবসায়টি কোন ধরনের? ব্যাখ্যা করো।
নাফিসের বাবার ব্যবসাটিকে প্রত্যক্ষ সেবামূলক এবং একই সাথে পণ্য বিনিময়ের সহায়ক ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। উদ্দীপকে দেখা যায়, নাফিসের বাবা গ্রামের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশাটি সরাসরি রোগীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে, যা একটি সেবামূলক কাজ। চিকিৎসকরা তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা ব্যবহার করে মানুষের রোগ নিরাময় করেন, যা কোনো ভৌত পণ্য উৎপাদন নয় বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকারী একটি সেবা। তাই চিকিৎসা পেশাটি হলো প্রত্যক্ষ সেবা শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নাফিসের বাবার প্রধান কাজ হলো সেবামূলক।
তবে উদ্দীপকে আরও বলা হয়েছে যে, তিনি চিকিৎসার পাশাপাশি 'মানসম্মত ওষুধও বিক্রি করেন'। ওষুধের এই বেচাকেনা বা বিক্রয় হলো মূলত পণ্য বিনিময় বা বাণিজ্য-এর অংশ। তিনি ওষুধ কিনে এনে রোগীদের কাছে বিক্রি করছেন, যা পণ্যের মালিকানা হস্তান্তরে সহায়ক। সাধারণত, পণ্য উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী থেকে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকেই বাণিজ্য বলা হয়। যেহেতু তিনি চিকিৎসাসেবাও দেন এবং ওষুধ বিক্রিও করেন, তাই তাঁর এই কার্যক্রমটি একই সাথে চিকিৎসা নামক সেবা এবং ঔষধ নামক পণ্য বিক্রয়ের সমন্বয়। অর্থাৎ, তিনি একদিকে একজন সেবাপ্রদানকারী এবং অন্যদিকে একজন খুচরা ব্যবসায়ী।
অর্থাৎ বলা যায়, নাফিসের বাবার এই ব্যবসাটিকে সেবাধর্মী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গণ্য করা যুক্তিযুক্ত। যদিও তিনি ওষুধ বিক্রি করেন, তবে তাঁর পেশার মূল ভিত্তি হলো চিকিৎসা সেবা, যার ওপর ভিত্তি করেই ওষুধের চাহিদা সৃষ্টি হয়। তাঁর চিকিৎসা দক্ষতা ও সেবাটিই হলো তাঁর ব্যবসায়ের প্রধান আকর্ষণ। ওষুধ বিক্রি সেই সেবার একটি সহযোগী বা পরিপূরক অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই, তাঁর ব্যবসাটি একাধারে স্বাস্থ্যসেবা শিল্প (সেবামূলক শিল্প) এবং বাণিজ্য (পণ্য বিনিময়ের সহায়ক কাজ)। এই দু'টির সমন্বিত রূপ, তবে প্রধানত এটি সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত।
ঘ. নাফিসের বাবার পক্ষে এলাকাবাসীর চাহিদা মাফিক ওষুধ সরবরাহ করতে না পারার প্রধান কারণ কোনটি বলে তুমি মনে করো? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
নাফিসের বাবার পক্ষে এলাকাবাসীর চাহিদা মাফিক ওষুধ সরবরাহ করতে না পারার প্রধান কারণটি হলো সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। উদ্দীপকের মূল সমস্যাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রামের একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি "সীমাবদ্ধতার কারণে সব ধরনের ওষুধ ক্রয় করতে পারেন না" এবং এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, "সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে ওষুধ কোম্পানির এজেন্টেরা প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো পৌঁছাতে পারে না।" অর্থাৎ, নাফিসের বাবার চাহিদামত ওষুধ সরবরাহের পথে প্রধান বাধা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব একটি ব্যবসায়ের জন্য বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রথমত, এটি সরবরাহ শৃঙ্খলকে ভেঙে দেয়। ওষুধ কোম্পানির এজেন্টরা হয়তো দুর্গম রাস্তা, দুর্বল পরিবহন সুবিধা বা অন্যান্য কারণে সময়মতো গ্রামে পৌঁছাতে পারেন না। এর ফলে, সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণের ওষুধ নাফিসের বাবার দোকানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। যেহেতু ওষুধ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখযুক্ত পণ্য এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত, তাই সময়মতো পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিলম্বে চিকিৎসক চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এজেন্টরা যদি দীর্ঘ ও কঠিন পথে আসতে বাধ্য হন, তবে তারা স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেশি ধরবেন, যা ওষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়। যদিও উদ্দীপকে সংরক্ষণের সমস্যার কারণে ওষুধ নষ্ট হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে এই সমস্যাটি প্রায়শই যোগাযোগ সমস্যার সাথে সম্পর্কযুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, যদি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ বা রেফ্রিজারেশন সুবিধা না থাকে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সরবরাহ বিলম্বিত হয়, তখন ওষুধগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তবে উদ্দীপকের বক্তব্য অনুসারে, সরবরাহ না পৌঁছানোর মূল কারণটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব।
পরিশেষে বলা যায়, নাফিসের বাবার ব্যবসাটিতে এলাকাবাসীর চাহিদা মেটাতে না পারার মূল বাধাটি হলো বাহ্যিক ভৌত পরিবেশ বা অর্থনৈতিক পরিবেশের অন্তর্গত যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা। যদিও সংরক্ষণের সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, তবুও যদি সময়মতো এবং সঠিকভাবে ওষুধ সরবরাহ করাই না যায়, তবে সংরক্ষণের সুযোগ পাওয়া যায় না। যদি যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হতো, তবে এজেন্টরা সহজে ওষুধ সরবরাহ করতে পারত এবং নাফিসের বাবা চাহিদামতো ওষুধ ক্রয় করে রোগীদের সেবা দিতে পারতেন। তাই, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থাই হলো সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রধান এবং মৌলিক কারণ, যার ফলে নাফিসের বাবা তার ব্যবসায়ের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারছেন না।
২ নং প্রশ্নের উত্তর
ক. কোন বস্ত্ৰের জন্য বাংলাদেশের খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল?
মসলিন বস্ত্রের জন্য বাংলাদেশের খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
খ. ব্যবসায়িক পরিবেশ বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।
ব্যবসায়িক পরিবেশ বলতে সেই সব প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক উপাদান বা শক্তিগুলোর সমষ্টিকে বোঝায়, যা কোনো ব্যবসায়ের কার্যকলাপ, প্রকৃতি, সফলতা, ব্যর্থতা এবং টিকে থাকার ক্ষমতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। একটি ব্যবসা বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না; এটি সর্বদা তার পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। এই পরিবেশের উপাদানগুলো অনুকূল হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ হয়, প্রসার ঘটে এবং মুনাফা বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে, পরিবেশ প্রতিকূল হলে ব্যবসায়ের পথে নানা বাধা আসে এবং ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। মূলত, একটি ব্যবসা যে অবস্থার মধ্যে পরিচালিত হয়, সেই সামগ্রিক অবস্থাকেই ব্যবসায়িক পরিবেশ বলা হয়।
ব্যবসায়িক পরিবেশের উপাদানগুলো সাধারণত ছয়টি প্রধান ভাগে বিভক্ত: প্রাকৃতিক পরিবেশ (জলবায়ু, নদ-নদী), অর্থনৈতিক পরিবেশ (মূলধন, বিনিয়োগ, সঞ্চয়), রাজনৈতিক পরিবেশ (সরকারের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক), সামাজিক পরিবেশ (ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম), আইনগত পরিবেশ (বাণিজ্য আইন, শিল্প আইন), এবং প্রযুক্তিগত পরিবেশ (প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি)।
গ. কোন পরিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্দীপকে উল্লিখিত শ্রমিক ও কারিগরদের সৃজনশীলতা বিকাশ সম্ভব? ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকে উল্লিখিত শ্রমিক ও কারিগরদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন। সামাজিক পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত হলো শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, এবং সর্বোপরি শ্রমিকের দক্ষতা ও মনোভাব। মসলিন বস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর জলীয়বাষ্পের পাশাপাশি "শ্রমিক ও কারিগরদের আন্তরিক পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা"র কথা বলা হয়েছে। সৃজনশীলতা একটি সহজাত মানবিক গুণ হলেও এর সঠিক বিকাশ এবং প্রয়োগের জন্য অনুকূল একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট প্রয়োজন।
সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন বলতে বোঝায় কারিগরদের মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা। ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো প্রয়োজন। যদি কারিগরদের সমাজে যথাযথ মর্যাদা থাকে, তাদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন করা হয় এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে তাদের সৃজনশীলতা আরও বিকশিত হবে। তাদের কাজের স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি এবং ভালো জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা সামাজিক পরিবেশের প্রধান অংশ। এই নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি পেলে তারা নতুন কৌশল উদ্ভাবনে এবং কাজের মান উন্নয়নে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হবে।
এছাড়াও, সামাজিক পরিবেশের সাথে প্রযুক্তিগত পরিবেশের সমন্বয়ও জরুরি। কারিগরদের সৃজনশীলতা যেন আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিলে নতুন ও উন্নত পণ্য তৈরি করতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে। মসলিনের ঐতিহ্যবাহী বুনন কৌশলকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি যদি নতুন ধরনের সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে তারা আরও কম সময়ে, অধিক মানসম্মত এবং বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন করতে পারবে। এর ফলে, একদিকে যেমন প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে তেমনই আধুনিক বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। সুতরাং, সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য সামাজিক সম্মান, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি শক্তিশালী সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন অপরিহার্য।
ঘ. বর্তমানে দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে উদ্দীপকে উল্লিখিত ব্যবসায়ের কোন পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি বলে তুমি মনে করো? তোমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাও।
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে উদ্দীপকে উল্লিখিত মসলিন শিল্পের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি হলো অর্থনৈতিক পরিবেশের উন্নয়ন। অর্থনৈতিক পরিবেশ বলতে মূলত মূলধন, অর্থ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং সরকারি আর্থিক নীতিমালার মতো উপাদানগুলোকে বোঝায়। মসলিনের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে এই উপাদানগুলোর শক্তিশালী ভিত্তি অপরিহার্য।
প্রথমত, মূলধন ও বিনিয়োগের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মসলিন বা এর মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পে সাধারণত প্রচুর প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াও সময়সাপেক্ষ। অর্থনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হলে উদ্যোক্তারা সহজে মূলধন পেলে তারা নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারবে, পুরোনো কারিগরদের কাজে লাগাতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারবে। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে; তাই এই অর্থনৈতিক পরিবেশের উন্নয়নই ব্যবসাকে গতিশীল করার প্রথম ধাপ। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্থনৈতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ব্যয় এবং সময়কে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। উদ্দীপকে যদিও মসলিনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপাদানের ভূমিকা প্রধান, কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সফল হতে হলে পণ্য উৎপাদনস্থল থেকে দ্রুত ও কম খরচে দেশি-বিদেশি বাজারে পৌঁছাতে হবে। এর জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা (রাস্তাঘাট, বন্দর), নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য। এই অবকাঠামো তৈরি হলে উৎপাদন খরচ কমবে, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হবে এবং ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করবে।
তৃতীয়ত, সুদৃঢ় ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসা সহায়ক নীতি, কর অবকাশ, ভর্তুকি এবং রপ্তানি সুবিধা দেওয়া হলে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবে। এর পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার, যেখানে মানুষ দেশীয় ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। সবশেষে বলা যায়, মসলিন শিল্পের অতীত গৌরব ফিরে আনা এবং দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। কারণ, প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ যত অনুকূলই হোক না কেন, যদি অর্থ ও মূলধনের অভাব থাকে এবং দুর্বল অবকাঠামো থাকে, তবে উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়বে। তাই অর্থনৈতিক পরিবেশের উন্নয়নই এই প্রসারের চাবিকাঠি বলে আমি মনে করি।
