পদার্থ বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ কীভাবে ঘটেছে?

বর্তমান যুগকে বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত বদলে দিতে চাচ্ছে, বদলাচ্ছে। এই বদলের পেছনে বিজ্ঞানের যতগুলো শাখার ভূমিকা আছে তার মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের ভূমিকা সবথেকে বেশি ভূমিকা রাখা শাখাগুলোর মতোই, বলা যেতে এরই বেশি। প্রাচীনকাল থেকে ধীরে ধীরে অসংখ্য বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমেই বর্তমান সময়ের বিজ্ঞান এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ আলোচনা করতে চাইলে পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সময়কালকে ভাগ করে নেয়া যাক। একে চারটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। (এনসিটিবি অনুমোদিত নবম-দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান বইতে একে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে।) ভাগ চারটি হলো:

  1. আদিপর্ব
  2. উত্থানপর্ব
  3. আধুনিক বিজ্ঞানের যুগ
  4. সাম্প্রতিক যুগ
পদার্থ বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ কীভাবে ঘটেছে?

আদিপর্ব (মুসলিম স্বর্ণযুগ, গ্রিক, ভারতবর্ষ এবং চীন)

খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ সময় পর্যন্ত আমরা মোটামুটিভাবে বিজ্ঞানের আদিযুগ বলতে পারি। এসময়ে বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কয়েকজন বিজ্ঞানীর নাম এবং কাজ আলাদাভাবে নিচে দেয়া হলো।

থেলিস: থেলিস গ্রিক বিজ্ঞানী। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬২৪ থেকে ৫৮৬ সময়কালে তিনি পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। তিনি সূর্যগ্রহন সম্পর্কিত ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন। লোডস্টোনের চৌম্বক ধর্ম সম্পর্কেও তিনি জানতেন।

পিথাগোরাস: গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানীদের মধ্যে তার নাম আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। জ্যামিতিতে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। জ্যামিতি ছাড়াও কম্পমান তারের ওপর তার মৌলিক কাজও ছিলো।

ডেমোক্রিটাস: গ্রিক এই দার্শনিক প্রথম পদার্থের অবিভাজ্য একক বা এটমের ধারণা দেন। 

এরিস্টটল: এরিস্টটলের একটি মতবাদ ছিলো যে, মাটি-পানি-বাতাস এবং আগুন দিয়েই সকল কিছু তৈরি। তার এই মতবাদটি সেই সময় অনেক বেশি গ্রহনযোগ্যতা পায়।

আরিস্তারাকস: সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণা দেন তিনি। 

আর্কিমিডিস: তরল পদার্থের ঊর্ধমুখী বলের বিষয়ে তিনি ধারণা দেন। গোলীয় দর্পনে সূর্যের রশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে দূর থেকে শত্রুর জাহাজে আগুনও ধরিয়েছিলেন তিনি। 

ইরাতোস্থিনিস: গ্রিক এই বিজ্ঞানী তার সময়েই সঠিকভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন।

আর্যভট্ট: ভারতীয় এই গণিতবিদের হাত ধরেই শূন্যকে সত্যিকার অর্থে ব্যবহার শুরু হয়।

ব্রহ্মগুপ্ত ও ভাস্কর: ভারতীয় এই দুইজনও গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় বিশেষ অবদান রাখেন।

আল-খোয়ারিজমি: ইসলামী স্বর্ণযুগের এই কাণ্ডারির হাত ধরেই বীজগণিত নতুন দিগন্তে পৌঁছায়। তার লেখা বই 'আল জাবির' থেকেই অ্যালজেবরা শব্দটির উৎপত্তি। তর্ক সাপেক্ষে অনেকে তাকে বীজগণিতের জনকও বলে থাকে

ইবনে আল হাইয়াম: হাসান ইবনে হাইয়ামকে আলোকবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। বস্তু থেকে আমাদের চোখে আলো আসলেই কেবল আমরা তাকে দেখতে পাই, এই কথা তিনিই বলেন।

আল মাসুদি: প্রকৃতির ইতিহাস নিয়ে ৩০ খন্ডের একটি এনসাইক্লোপিডিয়া লিখেছিলেন আল মাসুদি।

ওমর খৈয়াম: আধুনিক বীজগণিত, ইউক্লিডীয় জ্যামিতিসহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন ওমর খৈয়াম। 

শেন কুয়ো: চীনা এই বিজ্ঞানী চুম্বক নিয়ে কাজ করেছেন এবং ভ্রমোণের সময় কম্পাস ব্যবহার করে দিক নির্ধারণ করার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

বিজ্ঞানের উত্থানপর্ব

কোপার্নিকাস: ১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাস তার একটি বইয়ে সূর্যকেন্দ্রিক একটি সৌরজগতের ব্যাখ্যা দেন। 

গ্যালিলিও: কোপার্নিকাসের সৌরজগতের ব্যাখ্যাকে সকলের সামনে আনেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। গ্যালিলিওকে অনেক সময় আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

নিউটন: বল এবং গতিবিদ্যার ভিত্তি তৈরি তার দেয়া বলবিদ্যার তিনটি সূত্র এবং মহাকর্ষ সূত্র দেয়ার মাধ্যমে। বিজ্ঞানী লিবনিজের সাথে নিউটন মিলে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন।

কাউন্ট রামফোর্ড: তাপ যে এক প্রকারের শক্তি তা প্রথম প্রমাণ করেন তিনি। 

লর্ড কেলভিন: ১৮৫০ সালে লর্ড কেলভিন তাপ গতিবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছিলেন।

কুলম্ব: ১৭৭৮ সালে কুলম্ব বৈদ্যুতিক চার্জের ভেতরকার বলের জন্য সূত্র আবিষ্কার করেন। 

ভোল্টা: ১৮০০ সালে ভোল্টা বৈদ্যুতিক ব্যাটারি আবিষ্কার করেন। 

অরস্টেড: বিদ্যুৎ প্রবাহ দিয়ে চুম্বক তৈরি করা যায় এটি অরস্টেড দেখান। ফ্যারাডে এবং হেনরি ঠিক এর বিপরীত প্রক্রিয়াটি দেখান। 

ম্যাক্সওয়েল: ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল দেখান যে, আলো একটি বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ।

ইয়ং: ১৮০১ সালে ইয়োং আগেই আলোর তরঙ্গধর্মের প্রমাণ করে রেখেছিলেন।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান

ডাল্টন, থমসন, রাদারফোর্ড, বোর: পরমানুর গঠন নিয়ে এরা যুগান্তকারী কাজ করেন।

ম্যাক্স প্লাংক: কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কার করেন ম্যাক্স প্লাংক।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু: বিকিরণ সংক্রান্ত কোয়ান্টাম সংখ্যায়ন তত্ত্বের সঠিক গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অবদান রাখেন।

মাইকেলসন ও মোরলি: তারা দেখান যে ইথার বলতে কিছু নেই এবং আলোর বেগ স্থির এবং গতিশীল উভয় মাধ্যমেই সমান।

আইনস্টাইন: থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রদান করেন তিনি। E = mc^2 সূত্রটির সাহায্যে তিনি দেখান যে বস্তুর ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

ডিরাক: এন্টি পার্টিকেলের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন।

রন্টজেন: এক্স রে আবিষ্কার করেন।

বেকরেল: পরমানুর কেন্দ্র থেকে তেজস্ক্রিয় বিক্রিয়া হচ্ছে এটা তিনি দেখান। 

পিয়ারে কুরি এবং মেরি কুরি: রেডিয়াম আবিষ্কারের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তার দুয়ার আরও বেশি উম্মোচিত করেন।

সাম্প্রতিক পদার্থবিজ্ঞান

হাজার বছরের বিজ্ঞান চর্চা অব্যাহত আছে এখনো। সাম্প্রতিক সময়ে এসে আবিষ্কৃত হয়েছে আরও অনেক কিছু। নতুন নতুন কণা, হিগজ-বোসনকে প্রমাণ করা হয়েছে এ সময়েই। ডার্ক ম্যাটার এবং দার্ক এনার্জির ধারণা নিয়ে কাজ চলছে এখনো।

এভাবেই ঘটেছে পদার্থবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ।

Below Post Ad