জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় মুসলমানদের অবদান

বিজ্ঞানের ইতিহাসে ইসলামী স্বর্ণযুগ নামে একটি সময় ছিলো। যখন জ্ঞান বিজ্ঞানের পরতে পরতে মুসলমানদের ভূমিকা ছিলো অনেক বেশি। কালের বিবর্তনে তাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেছে। তবে যেটুকু রয়ে গেছে সেটুকুই বিশ্ববাসী স্মরণ করে, মনে রাখে সেই বিজ্ঞানীদের। সেটুকু দিয়েই আজকের বিজ্ঞানময় পৃথিবী বুঝে নেয় জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের ভূমিকা কতখানি।

জ্ঞান বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখায় মুসলমানদের অবদান


জাবির ইবনে হাইয়ান, আল-কিন্দী, আল-মাজরিতী, ওমর খৈয়াম, আল বিরুনী, ইবনে রুশদ, মুসা ইবনে আল-খোয়ারিজমিসহ অগণিত মুসলিম বিজ্ঞানীরা এবং মনীষীরাও বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করে গেছেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় মুসলিম মনীষীদের অবদান নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজনের প্রথম পর্ব এটি। এখানে আমরা উল্লেখ করব ৫ জনের অবদানকে।

সূচি (toc)


১. আব্বাস ইবনে ফিরনাস (আনুমানিক ৮১০ – ৮৮৭)

সফলভাবে প্রথমবার আকাশে উড়া ব্যক্তির নাম “আব্বাস ইবনে ফিরনাস” । তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা আছে আমাদের অন্য একটি আর্টিকেলে। সেটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন


২. মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি (আনুমানিক ৭৮০ – ৮৫০)

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খোয়ারিজমি বীজগণিতের ইতিহাসে টিকে থাকবেন ততদিন, যতদিন বীজগণিত/অ্যালজেবরা টিকে থাকবে। কারণ বীজগণিতের নামকরণই করা হয়েছে তার রচিত “আল কিতাব আল মুখতার আল হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালা” বইয়ের “আল-জাবর” অংশটুকু থেকে। তার রচিত এই বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান করার পদ্ধতি। বীজগণিতকে স্বাধীন শাখা হিসেবে তুলে ধরার কাজটিও তিনিই প্রথম করেন। বইটি এখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে সংরক্ষিত আছে।


তার নামের পর্তুগিজ সংস্করণ ‘অ্যালগারিসমো’ এবং স্প্যানিশ সংস্করণ ‘গুয়ারিসমো’ শব্দ দুটি দুই ভাষায় অংক অর্থে ব্যবহৃত হয়। তার নাম থেকে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দেরও উৎপত্তি।


আল খোয়ারিজমিকে অনেকে বীজগণিতের জনকও বলে থাকেন। বীজগণিতের জন্য আল খোয়ারিজমি অধিক পরিচিত হলেও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও তার বিচরণ ছিলো চোখে পরার মতো। খোয়ারিজিমি পাটিগণিত নিয়েও কাজ করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে মূল পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না। এছাড়াও টলেমির জিওগ্রাফির ভুলগুলো সংশোধন করে তিনি ‘কিতাব আল সুরত আল আর্দ’ লেখেন যার কপি স্ট্র্যাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে সংরক্ষিত আছে।


‘রিজালা ফি ইস্তিখরাজ তারিখ আল ইয়াহুদ’ নামের বইতে তিনি বছরের প্রথম দিন নির্ণয়ের উপায় বলে যান। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর তার লেখা ‘জিজ আল সিন্দহিন্দ’ নামক বইতে তিনি ১১৬টি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল উল্লেখ করেন, এর মাঝে তিনি সাইন এবং কোসাইনের অনুপাত নির্ণয় করে তাও যুক্ত করেন। এগুলোর বাইরে তার আরও অনেক কাজ ছিলো যা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

আল খোয়ারেজমি: বীজগণিতের জনক
১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকাশিত ডাকটিকিট। Image Source: Wikimedia Commons


মুসা আল খোয়ারিজিমি আনুমানিক ৭৮০ সালে খোরাসানে জন্মগ্রহন করেন যা বর্তমানে উজবেকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত। ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি মারা যান। ১৯৮৬ সালে আল খোয়ারিজমির আনুমানিক ১২০০ তম জন্মদিনে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে।


৩. হাসান ইবনে আল হাইসাম (আনুমানিক ৯৬৫ – ১০৪০)

বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে আসে? নাকি আমাদের চোখ থেকে আলো বস্তুতে যায়? ঠিক কোন কারণে আমরা কোনো বস্তু স্পষ্টত দেখতে পাই। এই বিষয়ে প্রথমবার সঠিক ধারনা ও প্রমাণ দেন হাসান ইবনে আল হাইসাম বা আল হাজেন। তাকে বলা হয় আলোকবিজ্ঞানের জনক। তাঁর সম্পর্কে পাঠগৃহের লেখা আলাদা কন্টেন্টটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন


৪. জাবির ইবনে হাইয়ান (আনুমানিক ৭২১ – ৮১৫)

পুরো নাম আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান আল আজাদি। তিনি আল হারানি, আল সুফি, আল কুফি, আল তুসি ইত্যাদি নামেও পরিচিত। ল্যাটিনে তাঁর নাম জেবার হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাঁর জন্ম আনুমানিক ৭২১ ও মৃত্যু ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে। খোরাসানের তুস নগরীতে তার জন্ম। তাঁর বাবাকে দেশোদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলে তারা তুস ছেড়ে পালিয়ে যায়। জাবির ইবনে হাইয়ানকে আরবীয় রসায়নের জনক বলা হয় এবং একই সাথে আধুনিক ফার্মেসির গোড়াপত্তনকারীও বলা হয়ে থাকে।

জাবির ইবনে হাইয়ান: রসায়নের মহানায়ক
জাবির ইবনে হাইয়ান। Image Source: goodreads


জাবির ইবনে হাইয়ানের কাজকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একভাগ অপরসায়ন এবং অন্যভাগ রসায়ন। রসায়নের মধ্যে তাঁর এমন অনেক কাজ আছে যা অনর্থক। আবার এমনও অনেক কাজ তিনি করেছেন যা আধুনিক রসায়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে একান্ত প্রয়োজনীয় ছিলো। তিনি তাঁর ‘কিতাব আল আহজার/বুক অব স্টোনস’-এ কৃত্রিম বিভিন্ন প্রাণি এমনকি মানুষ তৈরির প্রণালীও বর্ণনা করেন। তবে এদের প্রাণ দিতে পারেন শুধু আল্লাহ, এটি তিনি ঠিকই বিশ্বাস করতেন। এই বিশ্বাস থেকে জাবির আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুয়া করতেন বলেও জানা যায়।


জাবির ইবনে হাইয়ানের উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর মধ্যে আছে ইস্পাত তৈরি, মরিচা রোধকারী পদ্ধতি আবিষ্কার, উষ্ণতা-আদ্রতা-শুষ্কতা-শীতলতার ব্যাখ্যা, ধাতু থেকে স্বর্ণ পৃথক করা, অ্যাকোয়া রেজিয়া তৈরি, পাতন পদ্ধতি, স্ফটিককরণের মাধ্যমে বিশুদ্ধিকরণ, সিলভার নাইট্রেটের অধঃক্ষেপ, আর্সেনিয়াস অ্যাসিড তৈরি, ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড থেকে কাঁচ তৈরি ইত্যাদি। কাপড়ে রঙ করা, চামড়ায় ট্যানিং করার পদ্ধতিও তিনিই আবিষ্কার করেন।


তাঁর লেখা অসংখ্য বইয়ের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো ‘কিতাব আল রহমা আল-কাবির/দ্যা গ্রেট বুক অব মারসি’, ‘কিতাব আল-যুহরা/বুক অব ভেনাস’, ‘কিতাব আল-কিমিয়া/বুক অব কেমিস্ট্রি’, ‘কিতাব আল আহজার/বুক অব স্টোনস’।


৫. ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭)

বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী, দার্শনিকদের ভূমিকা আছে, তবে সবার নাম আমাদের কাছে পরিচিত না হলেও ‘ইবনে সিনা’ নামটি পরিচিত না হয়ে উপায় নেই। এই ইবনে সিনার পুরো নাম ‘আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা।’ তিনি পশ্চিমাদের কাছে ‘আভিসেনা’ নামে পরিচিত।


ইবনে সিনা অমর হয়ে আছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য। তাঁর লেখা ‘আল কানুন ফি আত-তিব/দ্যা ক্যানোন অব মেডিসিন’ বইটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সেরা বইগুলোর একটি। এই বইটি ১৮ শতক পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।


ইবনে সিনা কি কাফের ছিলেন?
ইবনে সিনা। Image Source: hmyhero.com


তাঁর ‘আল কানুন ফি আত-তিব’ গ্রন্থটি ৫ খন্ডে বিভক্ত ছিলো। প্রথম খন্ডটি আবার ৪ ভাগে বিভক্ত। প্রথম বইয়ের বিষয়বস্তু ছিলো মাটি, পানি, আগুন, বাতাস, অ্যানাটমি, পরিচ্ছনতা, অসুস্থতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা, ভেষজ রোগতত্ত্বসহ আরও অনেক কিছু। দ্বিতীয় খন্ড ছিলো ‘মেটেরিয়া মেডিকা’। ৩য় এবং ৪র্থ  খন্ডের নাম ছিলো ‘হেড টু টো ডিসিজেস’, ‘ডিসিজেস দ্যাট আর নট স্পেসিফিক টু সের্টেইন অরগানস’ যা মূলত ছিলো ‘ফিবার্স এন্ড আদার সিস্টেমিক এন্ড হিউমোরাল প্যাথোলোজিস’-এর উপর। শেষ খন্ডের শিরোনাম ছিলো ‘কম্পাউন্ড ড্রাগস’। ওই সময়ের অন্য যেকোনো বইয়ের থেকে এর গ্রহনযোগ্যতা অনেক বেশি ছিলো, এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এনসাইক্লোপিডিয়াও বলা হয়।


১০১২ সালে তিনি এই বই লেখা শুরু করেন এবং ১০২৪ সালে শেষ করেন। ২০১২ সালে তাঁর ১ হাজার বছর পূর্তি ছিলো। ইবনে সিনাই প্রথম ‘মেনেনজাইটিস’ শনাক্ত করেন। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে আরযুয়া ফিত-তিব্ব, লিসানুল আরব, আল মজনু, আল মুবাদাউন মায়াদা, আল মুখতাসারুল আওসাত, আল আরসাদুল কলিয়াসহ আরও অনেক। ‘কিতাব আল-শেফা/বুক অব দ্যা কিউর’ তাঁর জীবনের সেরা কাজগুলোর একটি।


ইবনে সিনা বাদশাহর লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ পান আমির নূহের চিকিৎসা করে। এছাড়াও সরকারি আরও অনেক কাজই তাকে করতে হয়েছে, অনেক সময় স্বেচ্ছায় আবার অনেক সময় নিজের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও। ইবনে সিনা ১০৩৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। হামাদানের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধের সময় তিনি আঘাত পান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আর তেমন সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।


ইবনে সিনার জীবনের শুরুটা হয়েছে ধার্মিক হিসেবেই। ১০ বছর বয়সে তিনি কুরআনের হাফিজও হন। নিজে শিয়া মতাদর্শী হলেও সুন্নি হানাফি এক শিক্ষকের কাছেও পড়েন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “যদি কোনো জটিল সমস্যা তিনি বুঝতে না পারতেন, তাহলে তিনি মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন এবং সেজদায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন”। তিনি ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কাজ করেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে ইবনে সিনা ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।


ইমাম গাজালি তাকে কাফির বলেছেন, ইবনুল কায়্যুমও এই বিষয়ের উপর একটি প্রবন্ধ লিখেন।  অনেকেই বলেন তিনি মৃত্যুর পূর্বে আবার ধর্মের দিকে ফিরে আসেন। তিনি শেষ জীবনে মুসলিম ছিলেন কি ছিলেন না তা আমরা জানি না, তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি যে টিকে থাকবেন শতাব্দীর পর শতাব্দী তা বলাই যায়।


তথ্যসূত্র

১. Boyer, Carl B., 1985.  A History of Mathematics, Page 252. Princeton University Press.

"Diophantus sometimes is called the father of algebra, but this title more appropriately belongs to al-Khowarizmi...”, "...the Al-jabr comes closer to the elementary algebra of today than the works of either Diophantus or Brahmagupta..."

২. Philosophy in the Islamic World

৩. Theories of vision from al-Kindi to Kepler

৪. Jabir ibn Hayyan

৫. রসায়নের প্রাণপুরুষ জাবির ইবনে হাইয়্যান

৬. Avicenna: Persian philosopher and scientist

Tags

Post a comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad