তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী এবং বর্ণালীর অঞ্চলসমূহ

তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী কি?

বিভিন্ন প্রকার তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণকে তাদের কম্পাংক বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী সাজালে বিদ্যুৎক্ষেত্র এবং চুম্বকক্ষেত্রের মিথস্ক্রিয়ায় মৌল থেকে যে বর্ণালী পাওয়া যায় তাকে তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী বলে।

তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালির অঞ্চলসমূহ হলো: 
  1. বেতার তরঙ্গ
  2. মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ
  3. অবলোহিত তরঙ্গ
  4. অতি বেগুনি তরঙ্গ  
  5. এক্স-রে 
  6. আলফা রশ্মি 
  7. বিটা রশ্মি 
  8. গামা রশ্মি 
তড়িৎ চুম্বকীয় বর্ণালী এবং বর্ণালীর অঞ্চলসমূহ



নিচে এদের প্রত্যেককে নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করা হলো।

১. গামা রশ্মি

তড়িৎ চুম্বকীয় রশ্মি সমূহের মধ্যে সবথেকে কম তরঙ্গদৈর্ঘ্য-এর রশ্মি হলো গামা রশ্মি। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য 5.0 x 10^-4 থেকে 1.5 x 10^-1 ন্যানোমিটার পর্যন্ত। এর কম্পাংকের ক্রম 10^18 থেকে 10^22। এটি বেশি শক্তির রশ্মি। তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থেকে গামা রশ্মি নির্গত হয়। আলফা এবং বিটা রশ্মিও সেখান থেকেই নির্গত হয়।

গামা রশ্মির ব্যবহার:

  • ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে।
  • চিকিৎসা সামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতে।
  • শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা নির্ণয়ে। 

২. আলফা রশ্মি 

আলফা রশ্মি হচ্ছে তেজস্ক্রিয় বস্তু হতে নির্গত He নিউক্লিয়াসের প্রবাহ। আলফা রশ্মির কতগুলো ভারী কণার সমষ্টি। প্রত্যেকটি কণার ভর 6.6 x 10^-27 kg। এরা +ve চার্জ বহন করে। আলফা রশ্মি বৈদ্যুতিক এবং চুম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয়। একেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ/বস্তু হতে আলফা রশ্মি একেক বেগে নির্গত হয়। 

আলফা রশ্মির ব্যবহার:

  • এই রশ্মি Smoke Detector হিসেবে কাজ করে।
  • ক্যান্সার কোষ ধ্বংসেও সফল।

৩. বিটা রশ্মি

বিটা রশ্মি খুব হালকা এবং ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত। এরা গ্যাসকে আয়নিত করে আবং ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভেদন ক্ষমতা সম্পন্ন এই রশ্মি কোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষিপ্ত হয়। একই সাথে এরা বৈদ্যুতিক্ষেত্র দ্বারাও বিক্ষিপ্ত হয়। 

৪. রঞ্জন রশ্মি (X-Ray)

এক্সরে টিউবের ক্যাথোড রশ্মি এর তড়িৎদ্বারে আঘাত করলে সেখান থেকে X-Ray নির্গত হয়। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য 10^-2 থেকে 2 ন্যানোমিটার। 

এক্সরে সরলরেখায় গমন করে। এর ভেদন ক্ষমতা এবং ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর এর প্রতিক্রিয়া আছে। গ্যাসের মধ্য দিয়ে যাবার সময় এটি গ্যাসকে আয়নিত করে। এছাড়াও এটি বিদ্যুৎ এবং চুম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় না, কারণ এটি ধনাত্মক বা ঋণাত্মক কোনো চার্জেই চার্জিত না। সাধারণ আলোকের ন্যায় এর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, ব্যতিচার, অপবর্তন এবং ব্যবর্তন ঘটে এবং চামড়ার উপর অনেক্ষণ ধরে এটি আপতিত হলে শরীরের ক্ষতিসাধন করে ।

রঞ্জন রশ্মির ব্যবহার:

  • শরীরের কোন অংশের হাড় স্থানচ্যুত হলে, হাড় ভেঙ্গে গেলে বা শরীরে কোন অবাঞ্চিত কিছু প্রবেশ করলে এর মাধ্যমে তা নির্ণয় করা হয়।
  • আলসার, ক্যান্সার, টিউমার ইত্যাদি নির্ণয়েও ব্যবহৃত হয়।
  • গোপন বাক্সে লুকানো বিস্ফোরক, আথেয়াস্ত্র বা নিষিদ্ধ দ্রব্য নির্ণয়ে ।
  • পেটে লুকানো হীরা, মুক্তা ইত্যাদি ধাতু সনাক্তকরনেও এক্স-রে ব্যবহৃত হয়।

৫. অতিবেগুনি রশ্মি (Ultraviolet Ray)

এটির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য 2 থেকে 400 nm (10 থেকে 380 nm) । এর উৎস মূলত সূর্য, অত্যন্ত উত্তপ্ত বস্তু, তড়িৎ বিচ্ছুরণ, কোয়ার্টজ টিউবে পারদ গ্যাসের মধ্যে হওয়া তড়িৎক্ষরণ। 

অতিবেগুনি রশ্মির ব্যবহার:

  • 230 nm থেকে 365 nm তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের UV রশ্মি ID শনাক্তকরণ ও লেবেল ট্রাকিংয়ে ব্যবহৃত হয়। 
  • 240 থেকে 280 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। 
  • 270 থেকে 360 nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মি প্রোটিন বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়।
  • 300 nm থেকে 320 nm তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের রশ্মি চিকিৎসা ক্ষেত্রে শরীরের চামড়ার উপর লাইট থেরাপিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 
  • জাল টাকা, জাল পাসপোর্ট, জাল কার্ড ও গোপন দলিল শনাক্তকরণে ব্যবহার আছে এর। 

৬. অবলোহিত রশ্মি (IR Ray)

দৃশ্যমান আলোর চেয়ে সামান্য বড় তরঙ্গদৈঘ্যের একটি তড়িৎ চুন্বকীয় তরঙ্গ অবলোহিত রশ্মি। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য 750 থেকে 10^6 nm পর্যন্ত। এর উৎসও মূলত সূর্য, অত্যন্ত উত্তপ্ত বস্তু। এছাড়া IR বাতি থেকেও পাওয়া যায় এমন রশ্মি। 

অবলোহিত রশ্মির ব্যবহার:

  • এই রশ্মি অন্ধকারে শোষিত হয় না । তাই অন্ধকারে লুকানো বস্তর অস্তিত নির্ণয়ে এটি ব্যবহৃত হয়। 
  • এই রশ্মিকে কাজে লাগিয়ে অন্ধকারে প্রাণী/মানুষ দেখার গগলস চেশমা) তৈরী করা হয়
  • বিমান বিধর্বসী মিসাইলে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণের কাজে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • এই রশ্মি রক্তনালীকে প্রসারিত ও বিস্তৃত করতে পারে তাই চিকিৎসাক্ষেত্রে এই রশ্যি ব্যবহৃত হয়

৭. মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ (Microwave Wave)

এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য 10^6 থেকে 10^8 এর মধ্যে। এটি বেতার তরঙ্গের থেকে ছোট। এর উৎস ম্যাগনেট্রন, গাইরোট্রন ইত্যাদি। 

মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গের ব্যবহার:

  • সাধারণ ব্রডকাস্টিং এ ব্যবহৃত হয়।
  • স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়।
  • মহাকাশযান যোগাযোগ, রাডার যন্ত্রে, নৌ ও বিমান চালনায় এই
  • খাবার গরম ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত মাইক্রোওভেনে এই ওয়েভ ব্যবহৃত হয়।

৮. বেতার তরঙ্গ (Radio Wave)

এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য 10^8 থেকে 10^12। যদি প্রশ্ন হয়, কোন তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি? বেতার তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল একে গাণিতিকভাবে প্রথম আবিষ্কার করেন। এর বেগ প্রায় আলোর বেগের সমান (শূন্য মাধ্যমে)। তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাহায্যে একে উৎপন্ন করা হয়। 

বেতার তরঙ্গের ব্যবহার:

  • রেডিও, টিভির শব্দ ছবি প্রেরণে।
  • MRI তে।
  • তারবিহীন যোগাযোগের ক্ষেত্রে। 

Post a comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Below Post Ad