ই-কমার্স কী?
ই-কমার্স (eCommerce বা ইলেকট্রনিক কমার্স) শব্দটির মানে আমরা সবাই কমবেশি বুঝি। দারাজ, আলিবাবা, আলিএক্সপ্রেস, অ্যামাজন, ফ্যান্সিকিবস, ফ্যান্সিহুইলস, কজি ভাইব বিডি, রকমারি, ঘরের বাজারের মতো যেকোনো অনলাইন শপ যারা অনলাইনের মাধ্যমে কোনো প্রোডাক্টের জন্য অর্ডার গ্রহন করার পর তার ডেলিভারি সম্পন্ন করে এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমেই পেমেন্ট রিসিভ করে - তারাই ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য।
ইলেকট্রনিক মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহন বলতে বর্তমান সময়ের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপগুলো যেমন নগদ, রকেট, বিকাশ রয়েছে; আবার সরাসরি ব্যাংকের অ্যাপও রয়েছে। ঘরে বসেই অর্ডার রিসিভ করা যাচ্ছে, ঘরে বসেই কুরিয়ার কোম্পানিকে ডাকা যাচ্ছে, তারা এসে প্রোডাক্ট সংগ্রহ করে কাস্টোমারের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং ঘরে বসেই পেমেন্টও রিসিভ করা যাচ্ছে। এই ধারণাটাই ই-কমার্সের ধারণা।
Kenneth C. Laudon এবং Carol Guercio Traver-এর E-commerce: Business, Technology, Society বইটি E-Commerce বিষয়ে বহুল ব্যবহৃত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যবই।
এই বইয়ের আলোচনায় E-Commerce-কে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্পর্ক, ব্যবসায়িক মডেল, বাজার, গ্রাহক, প্রযুক্তি এবং সমাজের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে E-Commerce শুধু ওয়েবসাইটে পণ্য প্রদর্শন নয়। এর মধ্যে ডিজিটাল বাজার, অনলাইন বিপণন, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট, গ্রাহকের আচরণ এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, একজন ক্রেতা কোন পণ্য দেখছেন, কীভাবে পণ্য নির্বাচন করছেন, কীভাবে পেমেন্ট করছেন এবং কীভাবে অর্ডার সম্পন্ন হচ্ছে, এসবই E-Commerce বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে।
Efraim Turban, Jon Outland, David King, Jae Kyu Lee, Ting-Peng Liang এবং Deborrah C. Turban-এর Electronic Commerce: A Managerial and Social Networks Perspective বইটি E-Commerce-এর ব্যবস্থাপনাগত ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো বিশ্লেষণ করে।
বইটিতে E-Commerce-এর পাশাপাশি B2B বাণিজ্য, মোবাইল কমার্স, সামাজিক বাণিজ্য, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট, নিরাপত্তা এবং অর্ডার পূরণ বা Order Fulfillment-এর মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে।
এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। অর্ডার পূরণ, পেমেন্ট, নিরাপত্তা এবং সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এসবের উপর ভিত্তি করে "ই-কমার্স কী?"- এই প্রশ্নের উত্তরে সহজে বলা যেতে পারে,
E-Commerce (Electronic Commerce) হলো ইন্টারনেট বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পাদনের প্রক্রিয়া।
ই-বিজনেস কী?
ই-বিজনেস হলো যেকোনো ধরনের ব্যবসার সামগ্রিক কাজকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে পরিচালনা করা। ধরুন আপনার একটা অনলাইন শপ আছে, কিন্তু আপনি অনলাইনে শুধু বেচাকেনা করেন, টাকা রিসিভ করেন- অর্থাৎ আপনার ই-কমার্স বিজনেস আছে ঠিকই, কিন্তু ই-বিজনেস কি বলা যাবে আপনার ব্যবসাকে? ই-বিজনেস বলা যাবে যদি আপনার ব্যবসার অন্যান্য দিকগুলোও আপনি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকেন। অর্থাৎ,
- Accounting: আয়-ব্যয়, লাভ-ক্ষতি ও আর্থিক হিসাব
- Inventory Management: স্টকের পরিমাণ ও পণ্যের হিসাব
- Sourcing & Procurement: সরবরাহকারী নির্বাচন ও পণ্য সংগ্রহ
- Restock Alerts: স্টক কমে গেলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা
- Forecasting: ভবিষ্যৎ চাহিদা ও বিক্রয়ের পূর্বাভাস
এই বিষয়গুলোও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে কোনো সফটওয়্যার/ERP এর মাধ্যমে করে থাকেন তাহলে তাকে বলা যাবে ই-বিজনেস।
E-Business (Electronic Business) হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা, সমন্বয় ও উন্নত করার প্রক্রিয়া।
Ravi Kalakota এবং Marcia Robinson-এর E-Business: Roadmap for Success বইটি E-Business-এর কৌশলগত ও সাংগঠনিক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
লেখকদের আলোচনায় E-Business কেবল নতুন একটি ওয়েবসাইট বা প্রযুক্তি যুক্ত করার বিষয় নয়। বরং প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবসার প্রক্রিয়া, সাংগঠনিক কাঠামো, গ্রাহক অভিজ্ঞতা এবং মূল্য সৃষ্টির পদ্ধতি উন্নত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধারণাটি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
একটি প্রতিষ্ঠান শুধু অনলাইনে পণ্য বিক্রি করলেই তার সব কার্যক্রম কার্যকর হয়ে যায় না। যদি স্টক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়, অর্ডার প্রসেসিং ধীর হয়, হিসাবের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকে অথবা গ্রাহকের অভিযোগের সমাধান না হয়, তাহলে অনলাইন বিক্রয় বাড়লেও ব্যবসার সামগ্রিক দক্ষতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অতএব, E-Business-এর মূল প্রশ্ন শুধু “কীভাবে অনলাইনে বিক্রি করব?” নয়; বরং “কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো ব্যবসাটিকে আরও কার্যকর করব” তা।
আশা করছি, ই-কমার্স এবং ই-বিজনেস এর পার্থক্যকটা বুঝা গেছে। এবার আরেকটা প্রশ্ন করা যাক।
যদি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স না হয়, অর্থাৎ অনলাইনে বিক্রি না করে; কিন্তু তাদের সবকিছু অর্থাৎ হিসাব রাখা, ইনভেন্টরির হিসাব রাখা, রিস্টক সিস্টেম, ট্রাঞ্জেকশন, ডিমান্ড ফরকাস্টিং, সোর্সিং সবকিছু ডিজিটাল মাধ্যমে করে একদম ১০০%, তাহলে কি তাকে ই-বিজনেস বলা যাবে?
উত্তর হচ্ছে "হ্যাঁ, বলা যাবে।" ই-কমার্স না হলেও ই-বিজনেস হওয়া যায়। এই এক প্রশ্নের সাথে আশা করি পুরো ব্যাপারটা পুরোপুরি ক্লিয়ার করা গেছে।
ই-বিজনেস পরিচালনার জন্য অনেকগুলো সিস্টেম আছে। এর মধ্যে কয়েকটা সিস্টেমের লিস্ট নিচে দিয়ে দিলাম, আশা করি আপনাদের কাজে লাগবে।
| সিস্টেম | পূর্ণরূপ | প্রধান কাজ |
|---|---|---|
| ERP | Enterprise Resource Planning | হিসাব, ইনভেন্টরি, ক্রয় ও বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয়। |
| CRM | Customer Relationship Management | গ্রাহকের তথ্য, অভিযোগ ও সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা। |
| SCM | Supply Chain Management | সোর্সিং, সরবরাহকারী, পরিবহন ও সাপ্লাই চেইন পরিচালনা। |
| MIS | Management Information System | ব্যবস্থাপনাগত প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তথ্য সরবরাহ। |
| TPS | Transaction Processing System | দৈনন্দিন লেনদেন, বিক্রয়, পেমেন্ট ও অর্ডারের তথ্য রেকর্ড। |
| DSS | Decision Support System | তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা। |
| HRIS | Human Resource Information System | কর্মী, বেতন, উপস্থিতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। |
| AIS | Accounting Information System | আয়-ব্যয়, লাভ-ক্ষতি ও আর্থিক হিসাব পরিচালনা। |
| WMS | Warehouse Management System | গুদামের পণ্য, স্টক ও পণ্য ওঠানো-নামানো ব্যবস্থাপনা। |
| BI | Business Intelligence | ডেটা বিশ্লেষণ, ড্যাশবোর্ড ও ব্যবসায়িক পূর্বাভাসে সহায়তা। |
| MRP | Material Requirements Planning | উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উপকরণের চাহিদা পরিকল্পনা। |
| POS | Point of Sale | ফিজিক্যাল দোকানে বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট লেনদেন পরিচালনা। |
দ্রষ্টব্য: সব প্রতিষ্ঠানে এই সিস্টেমগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়। ব্যবসার ধরন, আকার ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সিস্টেম নির্বাচন করা হয়।
