অতল গহ্বরে | সাকিব মাহমুদ (ফ্রি ডাউনলোড)

পাঠগৃহ নেটওয়ার্ক নিবেদন করছে সাকিব মাহমুদের লেখা "অতল গহ্বরে" সায়েন্স ফিকশনটি। সাকিব মাহমুদ পাঠগৃহ নেটওয়ার্ক এর একজন নিয়মিত লেখক। তিনি বর্তমানে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করছেন। তার লেখা এই সাইন্স ফিকশন এর PDF আপনি যদি ডাউনলোড করতে চান তবে নিম্নে দেওয়া লিঙ্ক থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।


ডাউনলোড অতল গহ্বরে

Google Drive Download link


মূল লেখা

১৩ মার্চ ২০১৯

ডায়েরি কিভাবে লিখতে হয় তা আমি জানিনা। যখন একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি ডায়েরি লিখব সেক্ষেত্রে শুরু তো করতে হবে কোনো না কোনো কিছু দিয়ে। নিজের বিষয়ে কিছু বলেই শুরু করা যায়! আজ নিজের সম্পর্কে বলি তারপর না হয় দেখা যাবে পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আর কি লেখা যায়।

আমি অনুপ। অধিকাংশই অনু বলে ডাকে। কেউবা অনু-পরমানু, রানু, সানু যা খুশি তাই বলে ডাকতে থাকে। আমি অবশ্য রাগ করিনা। কারণ নাম যাই ধরে ডাকুক না কেন আসলে আমাকে তারা চেনে এতোটুকুই যথেষ্ট। নাম একটি ভেরিয়েবল মাত্র। সৃষ্টিকর্তা আমাকে আলাদাভাবে সৃষ্টি করেছেন আর অন্যরা যাতে আমাকে চিনতে পারে তার জন্য একটা নাম আমার বাবা-মা রেখেছেন। আমাকে কোন নাম ধরে কারা ডাকলো সেটা নিয়ে বাজে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।

যদিও আমি আমার নাম ONU31416 বেশি ব্যবহার করে থাকি। PI আমার পছন্দের সংখ্যা আর আমার নামকে অধিকাংশ যেহেতু অনু ডাকে তাই ONU ব্যবহার করি আর সেটাকে ইউনিক বানানোর জন্য PI এর মান ব্যবহার করি। এটাই আমার কম্পিউটারের ইউজারনেম আবার অধিকাংশ গেমের জন্য ইউজারনেম হিসেবেও আমি এটাকে ব্যবহার করে থাকি।

বাড়িতে আমি আর আমার মা থাকি। বাবা কোথায় থাকেন সেটা আমি জানি না। তিনি বেঁচে আছেন কি না সেটাও আমাদের জানা নেই। যখনই আমি মাকে জিজ্ঞেস করি আমার বাবার ব্যাপারে, মা শুধু চোখ মোছেন। যখন থেকে আমি বুঝতে পেরেছি এটা তাকে কষ্ট দেয় তখন থেকে আর আমি মাকে সে প্রশ্ন করি না।

তবে যতটুকু জানি আমার বাবা ছিলেন একজন কম্পিউটার সাইন্টিস্ট। দেশী-বিদেশী বেশ কিছু কম্পানিতে তিনি চাকরি করতেন। সফটওয়্যার তৈরি করতেন সে সকল কম্পানি জন্য এবং বিভিন্ন হার্ডওয়ারের টেস্টিংও নাকি করতেন। এসব অবশ্য আমি জেনেছি বাবার পুরানো একটি ডায়রি থেকে।

বাসার আশেপাশে বা আমার এলাকাতে বন্ধুবান্ধব তেমন নেই। চেনা-পরিচিত আছে অনেকে কিন্তু তাদেরকে ঠিক বন্ধুর আসনে বসাতে পারিনা। তবে একজন বেশ ভালো মানের বন্ধু আছে। সে হচ্ছে আমাদের এলাকার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার যে কোম্পানি রয়েছে তাদের একজন কর্মচারী, নাম হারুন। স্কুলে আমরা একসাথে পড়তাম তবে হারুন লেখাপড়া ক্লাস ৫ এর পর আর করেনি। দরিদ্র পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় রোজগারের ভার পরে ওর উপর। ইন্টারনেটের কোন সমস্যা হলে ফোন দিলেই বেচারা রাত-বিরাতে হলেও এসে আমার কাজ করে দিয়ে যায়। একসঙ্গে গেমও খেলি আমরা।

এর বাইরেও আমার বন্ধু বলতে রয়েছে একটি কম্পিউটার। এখানে আমি যা ইচ্ছা তাই করি। কখনো গেম খেলি, কখনো লেখালেখি করি আবার কখনোবা বিভিন্ন সফটওয়্যার নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আর হ্যাকিং নিয়ে আমার রয়েছে বেশ একটি আলাদা ভালোবাসা যেটা আসলে একটু অন্য রকমের ভালোবাসা। কোন একটা সিকিউরিটি সিস্টেমে ঢুকে সেখানে কি হচ্ছে সেটা দেখার একটা মজাই আলাদা। আমার যে কম্পিউটারটার কথা বললাম ওখানে দুটো অপারেটিং সিস্টেম রয়েছে। মূলত দুটো আলাদা হার্ড ড্রাইভ আর দুটো আলাদা হার্ডড্রাইভে রয়েছে দুটো আলাদা আলাদা অপারেটিং সিস্টেম।

সবথেকে বড় যে হার্ডডিক্সটা রয়েছে সেটাতে আমি রেখেছি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম। মাঝেমধ্যে মা তার স্কুলের বাচ্চাদের জন্য মার্কশিট তৈরি করেন এটাতে।

এই মুহূর্তে আমার কাছে আরেকটা এক্সট্রা কম্পিউটার নেই যেটা মাকে দিতে পারবো, যেটা তিনি আলাদাভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। তাই কি আর করার একটি কম্পিউটার আমরা দুজন মিলে ব্যবহার করি। তবে আমি যখন কম্পিউটার ব্যবহার করি তখন মূলত লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করি। লিনাক্সের এমন একটি ডিস্ট্রো আমি ব্যবহার করি যেটা মূলত অধিকাংশ সময় সিকিউরিটি চেকিং এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। হ্যাকার সমাজের মধ্যে এটা সবথেকে বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৪ জুন ২০১৯

আজকে অনেকদিন পরে ডায়েরি লিখছি। হয়তোবা এরকম বিপদে না পড়লে বা এরকম একটি স্মরণীয় ঘটনা আমার সঙ্গে না ঘটলে আমি এই ডায়েরির কথা মনেই করতাম না। জন্মদিনের দিনে যে সংকল্প আমি নিয়েছিলাম সে সংকল্প অন্ততপক্ষে এখন পূর্ণ হতে চলেছে। হয়তোবা সামনে আমি প্রতিদিনই ডাইরি লিখতে থাকবো। এমন ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি যেটা আমাকে খুব একটা তাড়াতাড়ি স্বস্তি দেবে না। বাবার মত যদি কোনদিন অদ্ভুতভাবে হারিয়ে যাই অন্ততপক্ষে কি জন্য আমি হারিয়ে গেছি সেটা যাতে মানুষ জানতে পারে এজন্য ডায়েরিটা লিখছি। ঘটনাগুলো এখানে লিপিবদ্ধ করে রাখবো।

আজ থেকে ৩ দিন আগে চিলেকোঠায় খুঁজতে খুঁজতে বাবার পুরোনো কম্পিউটার এবং এনালগ নেটওয়ার্ক সিস্টেম খুঁজে পাই। এই নেটওয়ার্ক সিস্টেমগুলো মূলত কাজ করতো পুরোনো টেলিফোন নেটওয়ার্ক এর সাথে যুক্ত করে। আমাদের বাসায় দুটো টেলিফোন লাইন ছিল। এর একটা কাজ করতো অন্যটা নাকি বাবা শুধুমাত্র কি যেন একটা কাজে ব্যবহার করতেন।

এগুলো সবই দাদুর মুখ থেকে শোনা। দাদু যখন বেঁচে ছিলেন তখন হয়তো অনেকগুলো প্রশ্ন করতে পারতাম। কিন্তু তিনি তো বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। যতটুকু শুনেছিলাম টেলিফোন লাইন দুটো বিচ্ছিন্ন হয় ২০০৮ সালে প্রচন্ড ঝরে আমাদের বাড়ির পিছনে একটি গাছ যখন ভেঙে পড়ে ঠিক তখন। কিন্তু লাইনগুলো মাটির নিচ দিয়ে যাওয়ায় কিছু তার আমার ঘরের জানালা দিয়ে পাশের ঝোপের মধ্যে বের হয়ে থাকতে দেখা যেতো।

কিন্তু দুদিন আগে আমার মাথায় একটা ভূত চাপে। ভাবলাম বাবার এই কম্পিউটারটাকে চালিয়ে দেখা যায়। যদি চলে তবে তো ভালোই হবে! হয়তো আমি এটাতে আরো বেশকিছু যন্ত্র টেস্ট করতে পারব। কোন অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করতে পারবোনা ঠিকই কিন্তু তাতে কি? চলুক তো আগে।

তবে অবাক হলাম তখন যখন আমি পুরো কম্পিউটারটাকে মাল্টিপ্লাগ এর সাহায্যে ইলেকট্রিসিটির সাথে সংযুক্ত করি। কম্পিউটারটা চলছে! আর অবাক ব্যাপার হচ্ছে সব কিছুই সেই আগের মতন রয়েছে। যদিও আমি ততটা অবাক হই নাই কারণ এই ধরনের কম্পিউটার জাপানে তৈরি করা হতো এবং ইন্টারনেটে বেশ কিছু এরকম কম্পিউটার রেস্টোরেশন করতে দেখেছি যেগুলোর অধিকাংশই প্রথমবারে চালু হতে দেখেছি। তবে পুরোনো মডেমটি যে কাজ করছে এটা দেখে আমার সত্যিকার অর্থে অবাক লাগছে।

ওই দিন বিকেলে আমি হারুনকে বাসায় ডাকি কারণ ওর আগে টেলিফোন তার নিয়ে ঘাটাঘাটি করার এবং কাজ করার বেশ কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি ওকে বলি যে আমার বাসার পাশে যে দুটো টেলিফোন তার রয়েছে দুটোকেই আমি টেস্ট করতে চাচ্ছি যে এখনও সেগুলো কাজ করে কি না। তবে আমাদের পুরোনো টেলিফোনের সঙ্গে দুটো তার সংযোগ দিয়ে কোন ধরনের কানেকশন আমি পেলাম না।

হারুন অনেক চেষ্টা করল। অনেকভাবে সে তার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে তারের মধ্য দিয়ে সিগন্যাল সত্যিকার অর্থেই আসছে কি না বা যাচ্ছে কি না সেটা পরীক্ষা করার চেষ্টা করল। কিন্তু ফলাফল শুন্য! তারগুলো কাজ করছে না বা তারগুলোর শেষ প্রান্ত ঠিক যেখানে রয়েছে সেখানে হয়তো কোন যন্ত্রের সঙ্গেই সেগুলো যুক্ত নেই। যেন একটা বড় বৃহৎ জায়গা জুড়ে পড়ে রয়েছে তবে কোন যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত নেই মানে বৃহৎ জায়গা জুড়ে পড়ে থাকা তামার তার মাত্র। বেচারা হারুন শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয় আর মাথা ঠান্ডা করে মার বানানো গরম তালের বড়া খেয়ে বিদায় নেয়।

তবে আমি অবাক হয়েছি কিছু ঘন্টা আগের ঘটনায়। রাত বারোটার পর আমি ইন্টারনেট দেখে মডেম এবং টেলিফোন লাইনের সংযোগ তৈরি করি। এটা আমি শুধুমাত্র এজন্যই করেছিলাম যে ঠিক কিভাবে আগেকার মানুষ টেলিফোন তার এবং টেলিফোনের সঙ্গে মডেম ব্যবহার করতেন সেটা বুঝার জন্য। আমি কখনোই এক্সপেক্ট করিনি যে দুটো টেলিফোন তারের মধ্যে তুলনামূলক মোটা যে তার রয়েছে সেটি ঠিকভাবে সংযুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে সিগন্যাল পাওয়া যাবে। এই এলাকায় জানামতে আর একজনও টেলিফোন ব্যবহার করে বলে আমার মনে হয় না। তাহলে সেদিন বিকেলে হারুন যখন চেষ্টা করল তখন কেন কাজ করেনি? এর হিসাব আমি এখন মিলাতে পারছিনা! দেখি কাল সকালে এটা নিয়ে কিছুটা ঘাটাঘাটি করতে হবে।

৫ জুন ২০১৯

আজ সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে ইন্টারনেটে সার্চ করে মডেমের মডেল নাম্বার দিয়ে একটি ইউজার ম্যানুয়াল খুঁজে পাই। থ্যাংকস টু ইন্টারনেট আরকাইভ। এটা না থাকলে হয়তো আমি এই মডেমটা ঠিক কিভাবে অপারেট করতে হয় তা বুঝতেই পারতাম না। জিনিসটা সাধারণ। কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা খুব সহজে সচিত্র এখানে বুঝানো হয়েছে। এসব বুঝতে খুব একটা কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে দিনের বেলায় আমি একবারও ওই টেলিফোন লাইনকে সচল দেখিনি তবে তা কাজ করলো ঠিক রাত বারোটার পরে।

এখনকার সময় আমরা যেমন বিভিন্ন অ্যাপস এর মাধ্যমে অন্যদের সাথে বার্তা আদান-প্রদান করি তখনো কিন্তু এমনটা করা যেত। তথ্যগুলো এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে আদান প্রদানের ক্ষেত্রে মডেমগুলো সেগুলোকে এনালগ সিগন্যালে পরিবর্তন করত তারপর অপর কম্পিউটারে টেলিফোন লাইন ব্যবহার করে পাঠাত। আমি ইউজার ম্যানুয়াল দেখে দেখে চেষ্টা করলাম অন্য কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায় কিনা। আর মজার ব্যাপার হলো আমি সেটা পারলামও! পুরো নেটওয়ার্কে মনে হয় না আমার কম্পিউটার আর অন্য একটি কম্পিউটার ছাড়া অন্য কোন কম্পিউটার রয়েছে। পাসওয়ার্ড বা কোন এড্রেস আমাকে টাইপ করতে হলো না। সম্পূর্ণটা যেন পূর্ব থেকেই বাবার এই কম্পিউটারে সেভ করা ছিল।

ইন্টারফেসের কথা বললে শুধু একটা টেক্সট লেখার জন্য বক্স আর টেক্সট দেখার জন্য আর একটা খালি জায়গা, এর বাহিরে আর তেমন কিছুই নেই। একদম সাদামাটা! কোন ইমোজি নেই, কোন স্টিকার নেই, ছবি সেন্ড করার মতন কিছুই নেই। শুরুতেই “Hi” বললাম কিন্তু ওপাশ থেকে “Hello” বলার মতন কেউ ছিল কিনা জানিনা। তবে অনেক ইচ্ছে ছিল যেন কেউ একটা Hello বলে!

৮ জুন ২০১৯

আজ আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা আমি কি ঠিক দেখছি? সত্যিই ঘটছে নাকি আমার কল্পনা? নাকি এটা কোন যান্ত্রিক ত্রুটি? তবে যাই হোক না কেন জিনিসটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে এবং আনন্দ হচ্ছে! তবে কি আমি শেষ পর্যন্ত আমার বাবার ব্যাপারে খোঁজ পেতে চলেছি? আমি যা চেয়েছিলাম তাই হয়েছে। একটু দেরি করে হয়েছে তবে জিনিসটা হয়েছে। আমি অপরপ্রান্ত থেকে “Hello” ম্যাসেজ পেয়েছি!

অপরপ্রান্তে যেই থাকুক না কেন সে হয়তোবা আমার বাবার সম্পর্কে জানে অথবা আমি নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হতে চলেছি। যাই হোক না কেন আমার বেশ আনন্দ হচ্ছে! দেখা যাক ওপাশ থেকে কোন পরিচয় পাওয়া যায় নাকি।

১০ জুন ২০১৯

ওপাশ থেকে আর কোন সারা পাইনি। তাই আজ ভাবলাম কোন একটা উপায়ে নিজেই সেখানে উপস্থিত হতে পারতাম। তারটাকে অনুসরন করতে পারলেই হয়ত বা "Hello" বলা অপর প্রান্তের কাওকে পেতাম।

হারুনকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলায় আমাকে নিশ্চিত করে যে সে তারটাকে অনুসরণ করে শেষ প্রান্ত বের করতে পারবে। ওদের অফিসে বেশ কিছু যন্ত্র আছে যেগুলো দিয়ে তারে বিদুতের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। আর ধাতব পদার্থ খোজার জন্য একটা মেটাল ডিটেক্টরও আছে। কাল ফজরের নামাজ পড়ার পর হারুন সব নিয়ে আমাকে ডাকবে বলেছে। কাজটা সকাল সকাল করতে হবে কারণ বেশি মানুষের চোখে পরলে আমাদের পাগল বা তার চোর ভাবতে পারে।

১১ জুন ২০১৯

সকালে ফজরের নামাজের পর আমি এবং হারুন এই তারের হদিশ খুঁজতে বের হই। প্রকৃতপক্ষে তারটা খুব একটা মাটির নিচ দিয়ে যায়নি। ফুটখানিক গভীরতা দিয়ে তারটি আমাদের বাড়ির পিছনে জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। কিছু জায়গায় উচু হয়ে আছে, হয়ত বৃষ্টির কারনে মাটি ধুয়ে গেছে সেসব জায়গা থেকে। আর টেলিফোন লাইনটা গেছে বামদিকে বাজার রোড বরাবর যা আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। টেলিফোন লাইনটার আর অবশিষ্ট কিছু পেলাম না। চোর চুরি করেছে আর বাকিটা নতুন রাস্তার কাজ করার সময় সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে অন্য তারটা এখনো যে ভালো আছে তার প্রমান তো ছিল আগে থেকেই।

জঙ্গলের পুরোনো রেডিও টাওয়ারের কাছে গিয়ে তারটা আর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ট্রেস করা যায়নি। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ছোটবেলায় আমি হারুন এবং আমাদের সঙ্গে থাকা আরও অনেক বাচ্চারা এই জায়গাটাতে কত যে খেলেছি সেটা হঠাৎ করে আমাদের মনে পড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ বসে সেখানে পুরোনো দিনের অনেকগুলো স্মৃতির কথা একসঙ্গে আলোচনা করছিলাম। এখানে মুখ থুবড়ে কতবার যে আমরা গোল্লাছুট খেলতে গিয়ে পড়ে গেছিলাম সেটা এখনো মনে পড়লে বেশি হাসি আসছিল। তারপর হারুন পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ছবি তুলে পুরনো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে। তবে আমরা ছোট থাকতে এই জায়গাটা অনেকটা পরিষ্কার ছিল। স্কুল শেষে এই পথেই আমরা বাড়িতে আসতাম অথচ এখন এই জায়গাটা একটু বেশি জঙ্গলের মতো হয়ে গেছে।

ছোটবেলায় এই জায়গাটার উপর দিয়ে আমরা কত গিয়েছি অথচ এখানে যে এরকম একটা টেলিফোন তার আমাদের বাসা থেকে এসে নেমে গেছে সেটা তো জানতাম না। আমি আর হারুন সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল সকালে কোদাল নিয়ে সে জায়গাটাকে একটু খুঁড়ে দেখা যায়। যেহেতু জায়গাটা জঙ্গল হয়ে রয়েছে সেখানে তেমন মানুষ আসবেন না।

আমরা এখানকারই সন্তান। চোর অন্ততপক্ষে আমাদেরকে ভাববে না। আর যেহেতু জায়গার মালিক আমার কাকাবাবু সেহেতু চোর বলার ক্ষমতা কারো নেই। এলাকার কুকুর-বিড়াল মারা গেলে হারুন সেগুলো দাফন করে এটা পুরো এলাকাতে সবাই জানে। ওর মত এরকম সমাজসেবক ছেলে আর একটাও এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। মাটি খুঁড়তে দেখলে যে কেউ ভাববে কোন পশুকে দাফন করবে হারুন।

১২ জুন ২০১৯

আজ বেশ একটা অদ্ভুত ঘটনা আমাদের সঙ্গে ঘটে গেছে! আমরা যেটা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না সেটাই দেখতে হলো। সকালে ফজরের নামাজের পর হারুন আমাকে ডাকতে আসে। ওর হাতে ছিল কোদাল এবং একটি শাবল। আমরা দুজন সেই জায়গাটাতে চলে যাই যার কাছাকাছি পর্যন্ত আমরা সিগন্যাল পেয়েছিলাম। সেই বরাবর আমরা খুঁড়তে শুরু করে কিছু সময় পরে একটি চাকতির অবস্থান খুঁজে পাই। অনেকটা ম্যানহোলের ঢাকনার মত মনে হচ্ছিল।

ঢাকনার উপরে লেখা Uttom1969 যা দেখে আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। ভাবলাম তারটা আমার বাসা থেকে এসেছে। যে নামটা দেওয়া রয়েছে সেটা আমার বাবার নাম আর যে সংখ্যাটা আছে সেটা তার জন্মের বছর। ঢাকনাটা তুলতেই একটা চৌবাচ্চার মত কংক্রিটের দেয়াল আর একটা দরজা ছাড়া তেমন কিছুই দেখতে পেলাম না। তারটা ঐ ঢাকনার পাশ দিয়ে নেমে কংক্রিটের দেয়াল ঘেঁষে দরজার পাশ দিয়ে চলে গেছে।

হারুন আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দরজার ওই পাশে কি আছে তা আমরা দেখব। তাই শাবলের পিছন দিক দিয়ে তালার উপরে জোরে আঘাত করতেই তালাটি ভেঙে পড়ে যায়। ভিতরে ঢুকে একটা চেয়ার, তিনদিকে তিনটি দেয়ালের সঙ্গে এঁটে রাখা টেবিলে রাখা কিছু অসিলোস্কোপ, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি মাপার জন্য কিছু যন্ত্র ছাড়া আর তেমন কিছুই পেলাম না। পাশের সুইচ টিপতেই আলো জ্বলে উঠলো তারমানে ঐখানে বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। বিদ্যুতের সংযোগ টেলিফোন তারের মতো করে আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়েছে হয়তো।

তবে আমার চোখ ছানাবড়া করে দেয় দেয়ালে ইটের খোয়া দিয়ে লেখা একটি বাক্য। ইংরেজিতে খুব সুন্দর করে লেখা রয়েছে “Uttom Was Here” যেটা কিনা আমাকে ওই মুহূর্তে কাঁদতে বাধ্য করে। এখন আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত বাবা এখানে কাজ করতেন। টেলিফোন তারটি কোন কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত নেই বরঞ্চ একটা বক্সের মধ্যে তারটা ঢুকে গেছে। কিন্তু ওই বক্সের ভিতরে কি কি রয়েছে সেটা আমার জানা নেই। আমি সেখান থেকে বক্স বাসায় নিয়ে এসেছি। এখনো খুলে দেখিনি কারণ আমরা যখন বের হই তখন প্রায় বিকেল হয়ে গেছে। এত সময় কিভাবে পার হয়ে গেল কে জানে।

১৪ জুন ২০১৯

এবার বাবার সম্পর্কে মাকে আবার প্রশ্নটা করলাম। ওই জায়গাটার ব্যাপারে মা যেটা বললেন সেটা আমি আগে জানতাম না। মা যখন প্রথম বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসেন তখনই তিনি ওই সম্পর্কে জানতেন। বাবা নাকি বিয়ের পরবর্তী সময়ে রেডিও সিগন্যাল এবং নেটওয়ার্কিং নিয়ে কাজ করতেন। তিনি সবসময় কম খরচে কিভাবে ভালোমানের নেটওয়ার্ক সিস্টেম তৈরি করা যায় সেটা নিয়ে গবেষণা করতেন। তাই বাবার ল্যাব বলতে ওই জায়গাটায় ছিল সবচেয়ে আদর্শ জায়গা।

আমাদের পরিবারের সবাই ওই সম্পর্কে জানেন। আমি ছোট ছিলাম এবং আমার যখন তিন বছর বয়স তখনই নাকি বাবা ঐ ল্যাব থেকেই হারিয়ে যান। কাকাবাবুকে ফোন দিলাম তিনিও একই কথা বললেন এবং তিনি নাকি জায়গাটা আমার নামে লিখে দিয়েছেন। কাকাবাবুর আপন বলতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই তাই সব আমার কাছে আসবে সেটা ছোটবেলা থেকে সবার মুখ থেকে শুনে আসছি। এতে আমার কোন লোভ নেই।

বক্সটার যে তার ছিল সেটার সঙ্গে মডেমটার থেকে বের হওয়া তারটা লাগাই। মানে অনেকটা এমন যে মাঝের তার কমিয়ে দিয়েছি খালি। জিনিসটা দিব্যি কাজ করছে। তবে এখনও কোন উত্তর নেই। তবে অইদিন কিভাবে কে “Hello” বলেছিল? এটা জানার জন্য আমার বক্সটাকে খুলতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত খোলার কোন পথ দেখতে পাইনি।

১৬ জুন ২০১৯

অনেক চেষ্টার পর কাল আমি বক্সটা খুলতে পেরেছি। একটা ছিদ্র আছে যেখানে কোন লম্বা কিছু দিয়ে চাপ দিলে বক্সটার লক খুলে যায়। এর ভিতরে আছে বেশ কিছু সার্কিট। ভিতরে একটা কাগজে সব সার্কিট বিষয়ে লিখা আছে। এটা মিলিটারি কাজে যে আগেকার যুগে ব্যবহার করা হতো তা ভিতরের ঐ কাগজ থেকেই বুঝা যায়। যন্ত্রের মধ্যে যন্ত্র ঠিক করার ও বিভিন্ন পার্টস এর ব্যপারে লেখা।

যন্ত্রটা দুটি কাজ করে। এটি রেডিও সিগনালকে মডেমে পাঠায় আবার কম্পিউটার থেকে আগত সিগনাল রেডিও সিগনালে পরিবর্তন করে। এর সাথে থাকা কালো এন্টেনা রেডিও সিগনাল তৈরী করে। এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি আমার পুরনো এএম রেডিও চালু করে যন্ত্রটার পাশে রাখি আর কম্পিউটার থেকে “Hello I am ONU31416” লিখে send করি। রেডিওতে টু টু টু আওয়াজ শোনা গেল! এর মানে যন্ত্রটা কাজ করছে। তবে এটা কোন Frequency তে কাজ করছে তা ঠিক কোথাও বলা নেই। এর মানে যে আমাকে “Hello” বলেছিল সে এই রেডিও টাওয়ারের আওতাধীন এলাকাতে আছে।

২০ জুন ২০১৯

গত বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের বাড়ির আশেপাশে রাত দুইটার পরে কারা যেন টর্চ নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। পাহাড়ি এলাকাতে এতোরাতে কারো কাজ থাকতে পারে বলে মনে হয়না। কাল রাতে আমাদের বাড়ির পাঁচিল টপকে একজন ভিতরে চলে আসে। আমি উপর থেকে টর্চ মারতেই দেখি পাশের এলাকার কালা-রবিউল! কি জন্য এখানে ঢুকেছে জানতে চাওয়াতে বলে তার নাকি গরু হারিয়ে গেছে।

অন্যকেউ হলে হয়তবা ঝারি মেরে ক্থা বলতে পারতাম কিন্তু এ তো এলাকার নাম করা গুন্ডা। বাড়িতে মা আর আমি থাকি তাই লাগা-বাঝা করিনা কারো সাথে। আর যে লোক বছরের ৬ মাস জেলে থাকে তার সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এমনিতেও গাছের পেয়ারা ছাড়া আর কিছু নেই যেটা ও চুরি করতে পারবে।

২৫ জুন ২০১৯

আজ Police Station এ মা ও আমার নামে জিডি করে এলাম। পর পর বেশ কিছুদিন কালা-রবিউল ও তার চ্যালাপ্যালা আমাদের বাড়ির আশেপাশে সবসময় ঘুর-ঘুর করে। রাতে আমার জানালা বরাবর তাকিয়ে থাকে। নিজেদের ভিতরে বলাবলি করে ঠিক কতজন লাগবে আমাকে ধরাশায়ী করতে।

তবে আমি এটাই জানিনা ঠিক কি জন্য ওরা আমার পিছনে লেগেছে। আমার জানামতে আমি ওদের কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি বলে মনে পরে না। আর যতটুকু জানি ওরা অন্যদের জন্য কাজ করে, টাকা পায় কাজ শেষে।

২৭ জুন ২০১৯

এখন আমার কাছে সব পরিষ্কার। কালা-রবিউল কেন আমার পিছনে লেগেছিল আর আমি যে কতবড় বিপদের মধ্যে ছিলাম তার সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার। পুলিশের সঙ্গে দেখা করে আসার পরের দিন আমি যখন বিকালে হাঁটতে বের হই তখন হঠাৎ আমার পিছন থেকে কে যেন একটা রুমাল নাকে ঠেসে ধরে। বলার বাকি রাখেনা যে রুমালটাতে অজ্ঞান করার মত কিছু একটা ছিল।

জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি বাবার সেই ল্যাব এর মত আরেকটা ল্যাবে হাত-পা বাঁধা হয়ে পড়ে আছি। তবে ঐ ল্যাবে ছিল চারদিকে চারটা আরো দরজা। একটি থেকে ভেসে আসছে কেমিকেল এর ঘ্রান অন্যটি থেকে আসছে ঝালাই আর স্টিল ছিদ্র করার ড্রিলের শব্দ। সব মিলিয়ে ৫-৬ জন লোক আর সবাই কাজে ব্যস্ত। এর মধ্যে কালা-রবিউল আমার কাছে এসে জানতে চাইলো আমার পানি লাগবে কি না।

কিছু সময় পর আমার কাকাবাবু স্টিলের মই বেয়ে নামলেন। আমি ভাবলাম আমার কাকাবাবু একজন হিরো! যেভাবে আমাকে পেলেন তা হয়ত নায়করাও পারে না। তবে মুহূর্তে আমার সে ভাবনা ভোগে গেল। সবাই কাকাবাবুকে সালাম দিচ্ছে দেখে ঠিক বুঝলাম যে কাকাবাবুই এদের মাথা।

আমাকে দেখেই কাকাবাবু বললেন, “তুই একদম তোর বাপের মত হইছোস। সবখানে নাক না গলাইলে চলে না তোগো। তোর বাপে আমারে জ্বালাইত এহন তুই জ্বালাইতেছোস।” কাকাবাবুর এমন ভাষা আমি কখনো শুনিনি। তিনি সবসময় ভালো বাংলাতে কথা বলতেন। বোধয় তিনি এতদিন যে এলাকায় ছিলেন এটা সেখানকার ভাষা।

আমার কাছে তিনি জানতে চাইলেন আমি কিভাবে ঐ Frequency তে ঢুকেছিলাম। আমি সব খুলে বলি। তিনি উত্তরে বলেন, “Hi পাডায়। আবার আমার পাঠাগুলা Hello লিখা পাডায়।” আমার বার বার অবিশ্বাস হচ্ছিল। আর যাই হোক এ আমার কাকাবাবু না। আবার চেহারা আর হাটার ভাব দেখে ঠিকি কাকাবাবুর মত লাগছিল। হয়ত নিজের বিশ্বাস আর ভালোবাসা হঠাৎ ভেঙে গেলে এমনটাই হয়।

২ জন লোক একটা AK-47 বন্দুক নিয়ে পাশের দরজা দিয়ে বের হয়ে এলেন। কাকাবাবুকে বললেন নতুন ব্যাচ নাকি রেডি।

কাকাবাবু একটু দেখে বললেন জিনিসটা ভালো হয়েছে আর তাদের বললেন Team 4 কে সেগুলো পাঠাতে। এর পর একজন পাশের টেবিলে থাকা ঠিক বাবার ঐ কম্পিউটার এর মত একটাতে কি যেন টাইপ করলেন। তারপর কাকাবাবুকে বললেন যে Team 4 নাকি আগের ব্যাচ ঠিকভাবে ডেলিভারি দিয়েছে।

কালা-রবিউল আমাকে দেখিয়ে কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমাকে কি করবেন। কাকাবাবু তার হাতে থাকা বন্দুক আমার মাথায় ধরলেন। সে মুহূর্তে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। মার কথা মনে করে কেঁদে ফেললাম। মানুষটার আর কি থাকবে আমি মারা গেলে? আমি মারা গেলে কাঁদবে অনেক। হয়ত জানবেই না যে আমি আর নেই দুনিয়াতে। মাঝরাতে এখনো বাড়িতে নেই বলে মা হয়ত অনেক চিন্তা করছেন।

কাকাবাবু বন্দুকের ঘোরা টিপতে যাবেন ঠিক সেই মুহূর্তে মডেম বেজে উঠল। কে যেন কিছু একটা পাঠিয়েছেন। পাশে থাকা একজন জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন, “I know where you are. If you do anything with Onu… Remember I will kill you.” আর এটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কাকাবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল। হতবাক হয়ে আসেপাশে দেখতে থাকলেন। কিছুসময় পর লোহার ঢাকনায় বিকট একটা আওয়াজ হলো। ধপাশ করে অস্ত্র নিয়ে দুজন উপর থেকে নেমে এলেন। হ্যাঁ তারা আমাদের বাংলাদেশের আর্মি। তাদেরকে অস্ত্রসহ যেন একেকটা হিংস্র বাঘের মত লাগছিল। এই বোধয় থাবা বসাবে শিকারের উপর। কাকাবাবু AK-47 দিয়ে কেবল তাক করবেন ঠিক সে মুহূর্তে দুটো গুলি তার হাত এফোর-ওফোর করে বের হয়ে গেল। বাকিদের উদ্দেশ্য করে বলা হলো যদি তারা এক পা নড়ে তবে মাথা ফুটো করে দেওয়া হবে।

একজন এসে আমাকে সান্তনা দিলেন সঙ্গে বাহাবা দিলেন। আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হল। বাড়িতে নিয়ে এলেন তারা আমাকে। যাদের কিছু সময় আগেও বাঘের মত লাগছিল সেই তারাই মায়ের কাছে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যেন বড়ভাইদের মত লাগছিল।

আমার ঘরে গিয়ে দেখি হারুন একটানা বাবার কম্পিউটারে কি যেন লিখে চলেছে। খেয়াল করে দেখলাম সে “I know where you are. If you do anything with Onu… Remember I will kill you.” লিখেই চলেছে। হারুন সে রাতে আমার জীবন বাঁচায়। যদি ও এগুলো না লিখত তবে আমি হয়ত গুলি খাওয়ার পর আর্মি আসত। তবে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে কে বা কারা জানিয়েছিল তা এখনো জানিনা। সারারাত যা আমার সাথে ঘটেছে তার পরে কিছু সময় না ঘুমালে পাগল হতে হত। আজ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে ডায়েরিটা লিখছি। কাল আমাকে পুলিশ ও এই এলাকার গণ্য মান্য লোকেদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হয়েছে। হয়ত বাকি ঘটনা পরে ওখানে গিয়ে জানতে পারব।

২৮ জুন ২০১৯

আজ আমাকে সাহসিকতা প্রকাশ করার জন্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে! আমার কারনে নাকি Drugs এবং অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত কাকাবাবু ও তার আরো সাঙ্গোপাঙ্গকে ধরা সম্ভব হয়েছে। আমাকে কিভাবে তারা পেলেন এই ঘটনায় পুলিশকে জিজ্ঞাসা করার পরে তিনি যা বললেন তার জন্য আমি কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার ফোন থেকে নাকি তাদের কাছে একটি মেসেজ পাঠানো হয় যেখানে আমি যে গহ্বরে ছিলাম সেটার co-ordinates দেওয়া ছিল এবং বলা ছিল আমাকে নাকি সেখানে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বিকালে ঘুরতে বেরোবো বলে আমি আমার ফোনটিকে আমার ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে কম্বিনেশন লক করে বাইরে চলে এসেছিলাম। আমার মা ছাড়া আর কারও পক্ষে ওই ফোন ফোনের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে কীভাবে কে কোথা থেকে আমার মোবাইল ব্যবহার করে মেসেজটা পাঠিয়েছে সেটা আমি জানি না। আমি আমার ফোন চেক করেও দেখলাম, হ্যাঁ ঠিক সেটাই। আমার ফোন থেকে মেসেজ করা হয়েছে। আমি ছাড়া আমার ফোনের লক আর কেউ জানেন না। মেসেজটি পরিষ্কার বাংলা ভাষায় করা হয়েছে এবং এখানে আমার নাম এবং কী ধরনের বিপদ আসতে পারে তার সম্পূর্ণটা বলা হয়েছে আর কোথায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হতে পারে তার coordinate দেওয়া হয়েছে।

আমার ফোনটি কি তাহলে রিমোট ভাবে কন্ট্রোল করা যায়? এই ফোন দিয়ে অন্য কেউ কি সত্যিকার অর্থেই দূরে থেকে বসে মেসেজ করতে পারছে? আর যদি সত্যি তাই হয়ে থাকে তবে কে সে ব্যক্তি?

পুলিশ কর্মকর্তারা আমাকে সাধুবাদ জানালেন। বারবার তারা আমার প্রশংসা করেছিলেন। আমার সাহসের প্রশংসা করে এই মেসেজের কথা বারবার তারা উল্লেখ করেছিলেন। আমাকে বাহবা দিচ্ছিলেন কিন্তু মনে মনে আমি একটা কথা ভেবে চলেছিলম, এগুলো ঠিক কীভাবে সম্ভব? কে করছে এগুলো?

২৯ জুন ২০১৯

আজকের দিনটি আমার পরিবারের সকলের জন্য অনেক আনন্দের একটা দিন। কারন আজ সকালে আমার বাবা দরজায় কড়া নাড়েন এবং তার মুখ দেখে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। একটা লোক যে কিনা অনেকদিন আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন হঠাৎ করে তিনি ফিরে আসলেন তাও আবার এতগুলো ঘটনা ঘটার পরে! শুরুতে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সত্যিই ফিরে এসেছেন আমাদের দরজার সামনে? আমার মা ঠিকঠাক চিনতে পারলেন তাকে। দুজনেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এ কান্না আনন্দের কান্না।

বাবার সঙ্গে প্রথমবার কথা বলছি। বেশ ভালই লাগছিল। আজ থেকে অন্ততপক্ষে বলতে পারব যে আমার বাবা বেঁচে আছেন। আমাদের সঙ্গে আছেন বাবা। আমাকে দেখে তিনি বললেন যে আমি হয়তোবা তাকে দেখিনি কিন্তু তিনি সবসময় নাকি আমাকে দেখে রেখেছেন।

এই মেসেজটাও নাকি তিনি পাঠিয়েছিলেন। খাবার টেবিলে বসে এগুলো তিনি একের পর এক আমাদেরকে বলেছিলেন। হয়তো এতদিন যাবৎ কাউকে মন খুলে কোন কথা বলার মত সুযোগ পাননি। এর পরে তিনি আমাদের সামনে তার উধাও হওয়ার রহস্য উন্মোচন করেন। কাকা এবং বাবা দুজনে মিলে নেটওয়ার্কিং নিয়ে কাজ করছিলেন। তারা আমাদের এলাকায় এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেশকিছু এরকম রেডিও টাওয়ার তৈরি করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এই জায়গাটাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক বিস্তার ঘটানো। যাতে যোগাযোগের জন্য কোন সমস্যা না হয় তার জন্যই মূলত তাদের এই প্রকল্পটি ছিল। এর মাধ্যমে তারা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন যাতে করে এখানেই তারা বিভিন্ন পার্টস তৈরি করতে পারতেন এবং একইসঙ্গে প্রয়োজনানুযায়ী যন্ত্র উৎপাদন করতে পারতেন। আর এমনটা যদি সত্যিকার অর্থে হতো তবে এই এলাকাটি আজ হয়তো অনেক উন্নত একটি এলাকা হত। তারা জায়গা বাঁচানোর জন্য এরকম রুম গুলো তৈরি করেন যেখানে তারা মাটির নিচে রেডিও টাওয়ারটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যা যা প্রয়োজন তা রাখতে পারতেন।

তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই এলাকাটিকে সিলিকন ভ্যালির মতন করে গড়ে তোলার জন্য যেখানে যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক যত যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো তৈরি করা যাবে। সম্পূর্ণ কাজ করার পরে বাবা বুঝতে পারেন কাকার মনে খারাপ উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে। তিনি চাচ্ছিলেন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে এবং তিনি যে সকল বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চলতেন তাদের অনেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। বাবাকে বিভিন্নভাবে কাকা বুঝাতে চেষ্টা করেন কিন্তু বাবা তেমনটা চাচ্ছিলেন না। তিনি চাচ্ছিলেন জিনিসটাকে ভালো কাজে ব্যবহার করার জন্য।

একদিন রাতে বাবা তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কাকা এবং তার বেশ কিছু বন্ধু বাবাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। তাকে এটাও বলেন যে তিনি যদি এই ব্যবসা না করেন বা কাউকে এই বিষয়ে বলেন তবে পরিবারসহ তাকে হত্যা করা হবে। বাবা সেদিন পরিবারকে বাঁচানোর জন্যই নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এটি কাকা অথবা তার বন্ধু কেউ জানত না। তারা পরবর্তীতে হয়তো ভেবেছিলেন যে বাবা হয়তো সত্যি সত্যি মারা গেছেন।

তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে কখনো যোগাযোগ করেননি কারণ আমরা যদি জানি বাবা বেঁচে আছেন বা বাবা সত্যিকার অর্থে কোথাও রয়েছেন তবে সেটা কাকা জানতে পারলে আমাদেরকে সন্দেহ করতেন। এতে তিনি ভাবতেন আমরা তার ব্যবসা সম্পর্কে জানি।

কিন্তু বাবা দেশের অন্য প্রান্তে তার বন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। তিনি সেখানেই তার বন্ধুর সঙ্গে প্রযুক্তি বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন। সেখানেই তিনি মূলত দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির যে বদল ঘটেছে তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য হ্যাকিং এবং সিকিউরিটি বিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে থাকেন।

আমি ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করার পর থেকেই নাকি তিনি আমাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখতেন। আমি কোন গেম খেলতাম সেটাও তিনি জানতেন। একটি থার্ড-পার্টি সার্ভারে খেলার সময় তিনি আমার ফোনের অ্যাক্সেস নিয়ে ফেলেন। মোবাইলের আমি যত ডায়েরি লিখতাম এবং আমার কম্পিউটারের আমি যতগুলো ডাইরি লিখেছি সব গুলোই আমার বাবা পড়তেন। সেখান থেকে তিনি এ বিষয়টা সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ঘটনা আঁচ করতে পেরে তিনি আমাদের এলাকাতেই চলে আসেন।

ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি বেশ কিছু জায়গা ঘুরে দেখেন এবং সেগুলোর coordinate তিনি নোট করে রাখেন এবং যেদিন আমাকে চেতনানাশক কেমিক্যাল দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেদিন তিনি দূর থেকে আমাকে দেখেছিলেন এবং তার পরেই তিনি আমার ফোন থেকে তার ল্যাপটপের সাহায্যে মেসেজটির পুলিশের কাছে পাঠান। যেহেতু তিনি এতদিন সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করতেন তাই তার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনি এতদিন প্রমাণের অভাবে কাকাকে ধরিয়ে দিতে পারছিলেন না। কিন্তু সেদিন সে সুযোগটা হাতছাড়া করেননি। যেহেতু কাকা এখন বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন সেহেতু আমাদের পরিবারের উপর আর কোন বিপদ আছে বলে মনে হয় না।

২ জুলাই ২০১৯

আজ পত্রিকাগুলোতে প্রধান সংবাদগুলোর মধ্যে কাকা ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিচার হওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তার জন্য কাকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে এবং আর্থিক দন্ড হয়েছে অনেক। আর যে সকল সাঙ্গপাঙ্গ সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদেরকেও যথাযথ শাস্তি দেয়া হয়েছে। বাবা, আমি ও মা তিনজনে আজ বেশ ভালো খাবারের আয়োজন করেছি। দাওয়াত দেওয়া হয়েছে আমার প্রিয় বন্ধু হারুনকে।
Previous Post Next Post

এই লেখাটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ালে শেয়ার করুন 😇 হয়তো এমনও হতে পারে আপনার শেয়ার করা এই লেখাটির মাধ্যমে অন্য কেউ উপকৃত হচ্ছে! এবং কারো উপকার করার থেকে ভাল আর কি হতে পারে?🥺