করোনা ভাইরাস ( কোভিড-১৯ ) এর আদ্যোপান্ত


করোনা ভাইরাস ( কোভিড-১৯ ) এর আদ্যোপান্ত জানাতে  “পাঠগৃহ The Reading Room” এর এই সামান্য প্রচেষ্টা। শুরুতেই বলে নেই

ঘরে থাকুন ; সুস্থ থাকুন

তাহলে শুরু করা যাক করোনা ভাইরাস সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানার পালা ।

করোনাভাইরাস (CoV) হচ্ছে ভাইরাসগুলির একটি খুব বড় গোত্র যা সাধারণ সর্দি কাশি থেকে শুরু করে মারাত্মক অসুখ করতে পারে, যেমন Middle East Respiratory Syndrome (MERS-CoV), Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS-CoV) এবং কোভিড-১৯ (COVID-19) করোনাভাইরাসের অনেকগুলো প্রজাতির মাঝে ৭টি প্রজাতি মানবদেহে রোগ সৃষ্টি করে যার মাঝে SARS-CoV-2 অন্যতম। করোনাভাইরাসগুলি জুনোটিক, যার অর্থ তারা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ করতে পারে।

করোনা ভাইরাস ( কোভিড-১৯ ) এর আদ্যোপান্ত
সাধারন গঠন 


২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ্যাটিপিক্যাল নিউমোনিয়ার বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বছর জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে চীনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে তারা একটি নতুন ভাইরাস সনাক্ত করেছে এবং এই ভাইরাসটি একটি নতুন ধরনের করোনভাইরাস এই নতুন ভাইরাসটির অস্থায়ীভাবে নামকরণ করা হয়েছিল "2019-nCoV" বা “ নোভেল করোনা ভাইরাস” ।

বর্তমানে এই ভাইরাসটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে Severe Acute Respiratory Syndrome Coronavirus 2 বা SARS-CoV-2 এই ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগের নামকরণ করা হয়েছে Coronavirus Disease (COVID-19)

২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি রোগের আউটব্রেককে Public Health Emergency of International Concern (PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১১ মার্চ, ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এও ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী (Pandemic) হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে একে একে পুরোনো সব ভয়াবহতাকে। ইতোমধ্যেইএই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সারা বিশ্বে মারা গেছেন ৭৪ হাজার ৮২৫ জন মানুষ। আমাদের দেশেও ক্রমেই বাড়ছে এর সংক্রমণ। ইতোমধ্যে এই ভাইরাসে বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৬৪ জন এবং এদের মধ্যে মৃত ১৭ জন। সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ৩৩ জন। এই মহামারি থেকে রক্ষা পেতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সকলকেই। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা একটু দেখে নেয়া যাক।

বিশ্বজুড়ে করোনা পরিস্থিতি:

মোট আক্রান্ত
১৩ লক্ষ ৪৯ হাজার ৯১৮ জন

মোট মৃত
৭৪ হাজার ৮২৫ জন

সুস্থ হয়েছেন
২ লক্ষ ৮৬ হাজার ৮৭৭ জন

গত ২৪ ঘন্টায় বাংলাদেশে নতুন করে আক্রান্ত
৪১ জন

গত ২৪ ঘন্টায় বাংলাদেশে নতুন করে মৃত
৫ জন


এবার জেনে নেয়া যাক করোনার লক্ষণ ও এ থেকে বাঁচতে করণীয় কি।

করোনা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

  •  আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সরাসরি সংপর্ষে আসলে
  • আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশির মাধ্যমে ।
এ রোগে আক্রান্ত হলে কি কি লক্ষণ দেখা দেয়?

  •  ভাইরাস শরীরে ঢোকার পরে সংক্রমনের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় -১৪ দিন সময় লাগে
  • বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণ জ্বর
  • এছাড়া শুকনো কাশি হতে পারে
  • শ্বাসকষ্ট/ নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে
  • অন্যান্য অসুস্থতা (ডায়াবেটিস/ উচ্চ রক্তচাপ/ শ্বাসকষ্ট/ হৃদরোগ/ কিডনী রোগ/ ক্যান্সার ) থাকলে তা বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
সংক্রমণ প্রতিরোধে কি কি করণীয় ?
প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুই প্রকার:

  • ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও
  • কাশির শিষ্টাচার
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাঃ

  • সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার” ব্যবহার করে হাত পরিস্কার করা
  • অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করা
নিচের ধাপ অনুসরণ করে হাত ধুতে হবেঃ

  •  প্রথমে দুইহাত পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিন
  • এরপরে দুই হাতেই সাবান লাগিয়ে নিন
  • একহাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের তালু ঘষুন
  • এক হাতের তালু দিয়ে অন্য হাতের উল্টো পীঠ এবং আঙ্গুলের ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঘষুন
  • দুই তালু আঙ্গুলের ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ঘষুন
  • এক হাত দিয়ে অন্য হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘষুন 
  • ডান হাতের সব আঙ্গুল একসাথে অপর হাতের তালুতে ঘষুন
  • এবার পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুয়ে একটি পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে ফেলুন
জেনে নেয়া যাক কখন কখন হাত ধুতে হবেঃ

  • নাক পরিষ্কার করা, হাঁচি বা কাশি দেয়ার পরে
  • অসুস্থ কাউকে সবো দেয়ার আগে ও পরে
  • খাবার তৈরির আগে ও পরে
  • খাবার খাওয়ার পূর্বে
  • প্রতিবার টয়লেট ব্যবহার করার পরে
  • হাতে দৃশ্যমান কোনো ময়লা থাকলে
  • ময়লা-আবর্জনা ধরার পরে
  • কোন প্রাণী হাত দিয়ে ধরলে বা প্রাণীর ময়লা পরিষ্কার করার পরে
কি দিয়ে হাত ধুতে হবে-

  • সাবান-পানি হলো হাত ধোয়ার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়
  • হাতের কাছে সাবান না থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করা যাবে
কাশির শিষ্টাচার কি?

  • হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় টিস্যু দিয়ে অথবা কনুই ভাঁজ করে নাক মুখ ঢেকে রাখুন
  • ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনাযুক্ত বিন এ ফেলুন
  • যেখানে সেখানে থুথু/কফ ফেলার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • সর্দি/কাশি বা জ্বর এ আক্রান্ত হলে ডিসপাজেবল মাস্ক পরিধান করুন 
  • ব্যবহৃত মাস্ক প্রতি ৮ ঘন্টা পরপর বা হাঁচি-কাশি দেবার পর মাস্ক ভিজে গেলে পরিবর্তন করুন
আপনার নিজের কোন লক্ষণ দেখা দিলে কি করবেন?
 জ্বর, হাঁচি-কাশি, মাথাব্যাথা হলে-

  • রোগতত্ত্ব, রোগ নযি়ন্ত্রণ ও গবষেণা ইনস্টটিউিট এ হটলাইনে যোগাযোগ করুন।
  • পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য  আপনি একা আলাদা একটি রুমে আলাদাভাবে অবস্থান করুন ও সবসময় মাস্ক পরিধান করুন।
  • জরুরী কাজ ব্যতিত বাড়ীর বাইরে যাওয়া হতে বিরত থাকুন। জরুরী কাজে বাইরে গলেে মাস্ক পরিধান করুন।
  • সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে অন্তত ১ মিটার (৩ ফিট) দূরত্ব বজায় রাখুন 
  • ব্যবহার করা কাপড়চোপড় ভাল করে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন এবং আসবাবপত্র জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করুন ।
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে কি করবেন?

  • সংস্পর্শে আসার দিন থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত আলাদা একটি কক্ষে অবস্থান করুন ও সবসময় মাস্ক পরিধান করুন
  •  জরুরী কাজ ব্যতিত বাড়ীর বাইরে যাওয়া হতে বিরত থাকুন। জরুরী কাজে বাইরে গলে মাস্ক পরিধান করুন
  • সুস্থ ব্যক্তিদের থেকে অন্তত ১ মিটার (৩ ফিট) দূরত্ব বজায় রাখুন
  • এই ১৪ দিনের মধ্যে লাক্ষন দেখা দিলে রোগতত্ত্ব, রোগ নযি়ন্ত্রণ ও গবষেণা ইনস্টটিউিট এ হটলাইনে যোগাযোগ করুন ও আপনার অফিসে জানিয়ে দিন
  • ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা না দিলে  স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফেরত যেতে পারবেন
  • ব্যবহার করা কাপড়চোপড় ভাল করে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন এবং আসবাবপত্র জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করুন
বাড়িতে করণীয়

  • বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন
  • খাবার প্রস্তুত করার পুর্বে হাত ও কাঁচা খাবার ভাল করে ধুয়ে নিন
  • মাছ-মাংশ-ডিম ভাল করে রান্না করুন
  • অপ্রয়োজনে পশু-পাখি ধরবেন না, ধরলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন
  • অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন
রান্নার সময় যা যা মনে রাখা প্রয়োজন –

  • খাবার প্রস্তুত করার পুর্বে এবং পরিবেশনের আগে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • কাঁচা খাবার (শাক- সব্জি, ফল-মূল, মাছ-মাংশ) ভাল করে ধুয়ে নিন।
  • মাছ-মাংশ-ডিম ভাল করে (সিদ্ধ) রান্না করুন । আধা-সিদ্ধ খাবার খাওয়া যাবে না।
  • কোন প্রাণীর শ্লেষ্মা বা মল হাতে লাগলে দ্রুত সাবান পানি দিয়ে হাত পরিস্কার করুন
  • খাবার প্রস্তুত করার সময় উচ্ছিষ্ট জিনিস খোলা জায়গায় ফেলবেন না। ঢাকনাবদ্ধ পাত্রে উচ্ছিষ্ট রাখুন ও পরে ময়লা ফেলার নির্ধারিত স্থানে ফেলুন। খেয়াল রাখবেন বিড়াল, কুকুর বা কাক যেন ময়লা না ছিটায়। রান্নাঘর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • রান্না বা খাবার পরিবেশনের সময়ে হাঁচি বা কাশি না দেয়ার চেষ্টা করুন । প্রয়োজনবোধে মাস্ক ব্যবহার করুন ।
শেষে এসে আবারও বলছি , অতি প্রয়োজনীয় কোনো কাজ ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হবেন না।


ঘরে থাকুন ; সুস্থ থাকুন
এছাড়াও

“ পাঠগৃহ The Reading Room এর সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ। নিয়মিত প্রয়োজনীয় ও নিত্য নতুন তথ্য জানতে আমাদের সাথেই থাকুন ।

- মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম  
পাঠগৃহ The Reading Room 

Post a comment

0 Comments